✅সৌদি আরবে সত্যার্থ প্রকাশ রাখার অপরাধে যখন এক আর্যের জেল হলো
ভারত থেকে সহস্র মাইল দূরে সৌদি আরবে শ্রী রাজকুমার ভরদ্বাজ নামক এক ব্যক্তিকে এইজন্য জেলে পুরে দেওয়া হয়েছিল কারণ তাঁর কাছে সত্যার্থ প্রকাশ ছিল। তখন সৌদি আরবে ইসলামের গ্রন্থসমূহ ব্যতিরেকে অন্য কোনো সমালোচনাত্মক গ্রন্থ রাখা নিষিদ্ধ ছিল, এখনো তাই।
শ্রী রামকুমার ভরদ্বাজ যে কোনো প্রকারে জেল থেকে মে, ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে একটি পত্র সার্বদেশিক সভাকে পাঠান তথা নিজের গ্রেফতারির বিবরণ দিয়ে নিজের মুক্তির ব্যবস্থা করার প্রার্থনা করেন। শ্রী ভরদ্বাজ হরিয়ানার নিবাসী তথা তাঁর পরিবার আর্য-সমাজী। তাঁকে একটি ভারতীয় কোম্পানির মাধ্যমে সৌদি আরবে চাকরির জন্য পাঠানো হয়েছিল। সেখানে যাওয়ার সময় তিনি নিজের সাথে কিছু পুস্তক নিয়ে গিয়েছিলেন যার মধ্যে সত্যার্থ প্রকাশও ছিল। উদ্দেশ্য যেন অন্য সনাতনীরা কোনোভাবে বিভ্রান্ত হয়ে ধর্মান্তর না হয়, এবং বৈদিক সত্য সনাতনের প্রকৃত মাহাত্ম্য তুলে ধরা যায়। কিন্তু নিষিদ্ধ সাহিত্য রাখার অভিযোগে তাঁকে জেলে পুরে দেওয়া হয়।
সভা কর্তৃক শ্রী ভরদ্বাজের পত্র প্রাপ্ত হওয়ার পর সভার প্রধান শ্রী রামগোপাল শালওয়ালে প্রধানমন্ত্রী তথা বিদেশ মন্ত্রালয়কে পত্র লিখে তাঁদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেন। দিল্লিস্থিত সৌদি আরব দূতাবাসেও পত্র লেখা হয় তথা রামকুমার ভরদ্বাজকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার দাবি করা হয়। বিদেশ মন্ত্রালয়ের পত্রে এটি লেখা হয়েছিল যে বহুসংখ্যক হিন্দু রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও ভারত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র তথা এখানে সকল ধর্মের ও সম্প্রদায়ের লোকেদের পূর্ণ ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও আর্থিক স্বাধীনতা এবং সমতা প্রাপ্ত। কিন্তু ভারতেরই মিত্র মনে করা দেশ সৌদি আরবে ভারতীয় নাগরিকদের সাথে এই প্রকারের বৈষম্যমূলক কার্য এবং তার সাহিত্যের ওপর এই প্রকারের কড়া নিষেধাজ্ঞা অপমানজনক কথা। এই ঘটনায় আর্যসমাজীদের এবং সম্পূর্ণ হিন্দু সমাজে ভারী উত্তেজনা এবং অসন্তোষ তৈরি হয়ে গেছে, অতএব সরকার এই বিষয়ে অবিলম্বে উচ্চ-স্তরীয় কার্যধারা গ্রহণ করুক।
এর উত্তরে বিদেশ মন্ত্রালয় বড় আজব উত্তর দিল। সে শুধু এতটুকুই লিখল যে আরবের আইন অনুসারে সৌদি আরবে নিষিদ্ধ সাহিত্য রাখা ও পড়া অপরাধ, এইজন্য রামকুমার ভরদ্বাজকে জেলের সাজা দেওয়া হয়েছে। এই পত্রের পর বিদেশ মন্ত্রালয়ের দ্বিতীয় একটি সংক্ষিপ্ত পত্রও মিলল, যাতে সভা-প্রধানকে সূচনা দেওয়া হয়েছিল যে শ্রী ভরদ্বাজের বিষয়ে সরকার উচিত কার্যক্রম গ্রহণ করছে, তথা যেমনই ওখান থেকে কোনো তথ্য মিলবে আপনাকে সূচিত করা হবে।
সার্বদেশিক সভা বিদেশ মন্ত্রালয়কে আরও একটি কড়া পত্র লিখল যাতে জনগণের আক্রোশের জন্য সরকারের ঢিলেঢালা নীতিকে দায়ী করা হয়েছিল। এর উত্তরে বিদেশ মন্ত্রালয় ১০ নভেম্বর ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে একটি পত্র লিখে জানাল যে সভা ৩০ অক্টোবর ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে প্রধানমন্ত্রীকে যে পত্র পাঠিয়েছিল তার আধারে সৌদি আরবের বিদেশ বিভাগের সাথে রিয়াদস্থিত আমাদের দূতাবাসের উচ্চ-স্তরীয় কথাবার্তা চলছে। আশা আছে যে কথাবার্তার সফল পরিণাম বেরোতে পারবে।
সার্বদেশিক সভার অন্তরঙ্গ সভা নিজের ১৪ ডিসেম্বর ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দের বৈঠকে স্থিতির ওপর পুনর্বিচার করল তথা এটি সিদ্ধান্ত নিল যে- যদি ১১ জানুয়ারি ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শ্রী ভরদ্বাজকে মুক্ত না করা হয় তবে সারা ভারতে 'সত্যার্থ প্রকাশ-রক্ষা-দিবস' পালন করা হোক এবং ১৪ জানুয়ারি দিল্লি স্থিত সৌদি আরব দূতাবাসের সামনে প্রচণ্ড বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হোক।
ভারত সরকারের প্রয়াসে রামকুমারকে ৭ মাসের জেলের পর মুক্ত করে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু সরকার সভাকে এর সূচনা দেওয়ার শিষ্টতা দেখায়নি। সভা হরিয়ানা আর্য প্রতিনিধি সভার এক উপদেশক শ্রী সুখদেব শাস্ত্রীকে ভরদ্বাজের পিতা শ্রী হরিসিংহের কাছে তাঁর বিষয়ে পুরো তথ্য নেওয়ার জন্য পাঠায় যিনি তাঁদের গ্রাম শাহপুরা যান যেখানে এই শুভ সংবাদ মিলল। শ্রী ভরদ্বাজ ডিসেম্বরে মুক্ত হয়ে সেখানে এসে গেছেন।
এই সমাচারে আর্য জগতে হর্ষ এবং সন্তোষের লহর দৌড়ে গেল। তাঁকে ২৫ ডিসেম্বর ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে শ্রদ্ধানন্দ বলিদান দিবসের শোভা-যাত্রায় তথা এই অবসরে লাল কেল্লার ময়দানে আয়োজিত জনসভায় আমন্ত্রিত করা হলো। সভা শ্রী ভরদ্বাজের স্বাগত করল। শ্রী ভরদ্বাজ নিজের ভাষণে বললেন—
“আমি আর্যসমাজ এবং সার্বদেশিক সভার হৃদয় থেকে কৃতজ্ঞ যারা আমার মতো সামান্য আর্যসমাজীর জীবনের গম্ভীর সংকটের সময় একটি অভেদ্য দেওয়ালের মতো দাঁড়িয়ে আমার সাহায্য করেছে। আমি এই প্রকারে নিজের জীবন নিয়ে নিরাশ হয়ে পড়েছিলাম। সৌদি আরব যাওয়ার সময় ওখানে ধর্মীয় গ্রন্থসমূহের ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে আমার সে বিষয়ে কোনো তথ্য ছিল না। যে কোম্পানি আমাকে পাঠিয়েছিল সেও এই বিষয়ে আমাকে কিছু বলেনি। আমি হরিয়ানা-নিবাসী। সৌদি আরব চাকরিতে যাওয়ার সময় আমি নিজের সাথে সত্যার্থ প্রকাশ ও কিছু অন্য বৈদিক সাহিত্য এবং দুটি ও৩ম্-ধ্বজ সাথে নিয়ে গিয়েছিলাম।
আমার এই বিষয়ে গভীর দুঃখ আছে যে আমারই এক সাথী ফৈজ মহম্মদ যে হায়দরাবাদের নিবাসী, আমাকে একান্তে সত্যার্থ প্রকাশ পড়তে দেখেছিল। পড়া সমাপ্ত হলে সে আমাকে এটি বলে যে আমিও ওটি দেখতে চাই সে পুস্তকটি আমার থেকে নিয়ে নিল। সে আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করল। সে আমার এই বিষয়ের রিপোর্ট সৌদি পুলিশে করে দিল এবং পুস্তকটিকে সেনা সদর দপ্তরে জমা করিয়ে দিল। রাষ্ট্রীয় নাড়ির টান ভেঙে সে নিজের মজহবি (ধর্মীয়) রূপে এসে গেল। সত্যার্থ প্রকাশে স্বামী জী কোরানের বিষয়ে যা লিখেছেন তার আরবি অনুবাদ করানো হলো। আমাকে এই অপরাধে খুব মারা-পিটা হলো। হাত-পা বেঁধে জেলে পুরে দেওয়া হলো। জেলেও যাতনা দেওয়া হলো।
আমার বড় দুঃখ হয় যে ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র এবং এখানে সবাইকে সব প্রকারের আজাদি আছে। কিন্তু এখান থেকে যখন কোনো হিন্দু মিত্র-রাষ্ট্রসমূহে যায় তো তার সাথে এমন ব্যবহার করা হয় এবং তাদের ধর্মীয় আইন আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতার শিকড় কাটে। আমি ধর্মের পালন করেছি এবং ওখানে বড় কষ্ট সয়েছি। আমি ভয়ঙ্কর যাতনায় দুঃখী হয়ে কোনোভাবে চুরি-ছিপিয়ে (লুকিয়ে) নিজের মুক্তি ও সাহায্যের জন্য সার্বদেশিক সভার প্রধান শ্রী স্বামী আনন্দবোধ জীকে পত্র লিখেছিলাম। শ্রী স্বামী জী এই সম্বন্ধে যে সক্ষম কদম উঠিয়েছেন, তারই কারণে আমাকে এই মাসেই চুপচাপ রাত্রি ১০ টায় জেল থেকে মুক্ত করে ভারতে পাঠানো হয়েছে। আমি এই কার্যধারার জন্য শ্রী স্বামী জী, সার্বদেশিক সভা এবং আর্যসমাজের আভারী (কৃতজ্ঞ)। আমার সাথে ওখানে অন্য দুই হিন্দু যুবক শ্রী ব্রহ্মপ্রকাশ এবং ধর্মবীরও জেলে আছে, তাদের কী হলো, আমি বলতে পারছি না।”
সভা-প্রধান উপর্যুক্ত ঘটনার ওপর বললেন যে, "আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতার সিদ্ধান্তের ওপর এটি একটি চড়। আমাদের মিত্র রাষ্ট্রের নাগরিক যখন ভারতে আসে, তারা সব প্রকারের আজাদি ও স্বতন্ত্রতা পায়, কিন্তু ভারতের কোনো নাগরিক যদি ওখানে যায় আর তার সাথে এই প্রকারের দুর্ব্যবহার করা হয়, এটি গম্ভীর স্থিতি।" সার্বদেশিক সভা ভারত সরকারের কাছে দাবি করছে যে সে ধর্মনিরপেক্ষতার সিদ্ধান্তের ওপর পুনর্বিচার করুক।
শ্রী ভরদ্বাজের মুক্তির পর আর্যসমাজের ১১ জানুয়ারি এবং ১৪ জানুয়ারি ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দের কার্যক্রম স্থগিত করে দেওয়া হলো।
এই ঘটনার সময় হায়দরাবাদের মুসলমানদের তরফ থেকে ডিসেম্বর ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দেই ইসলামিক ইউথ সংস্থার জেনারেল সেক্রেটারি শ্রী অফসর ফৈজী একটি বক্তব্য জারি করে ভারত সরকারের কাছে সত্যার্থ প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা লাগানোর দাবি করেন। এর থেকে স্পষ্ট যে সৌদি আরবের ঘটনার সূচনা তথা ভরদ্বাজের মুক্তির কথা মুসলমানদের আগেই জানা হয়ে গিয়েছিল। অন্যথা ফৈজীর দাবির জন্য কোনো তাৎক্ষণিক কারণ ছিল না।
শ্রী ফৈজীর এই বক্তব্যের তীব্র বিরোধ করা হলো। এর বিরোধে আর্য-সমাজের পক্ষ থেকে প্রচারিত বক্তব্য হায়দরাবাদের পত্রিকাসমূহ প্রকাশিত করেনি। এর ওপর আর্য প্রতিনিধি সভা অন্ধ্রপ্রদেশের পক্ষ থেকে মুখ্যমন্ত্রী এবং রাজ্যের মুখ্য সচিবকে পত্র লিখে তাঁদের সতর্ক করা হলো যে শ্রী ফৈজী ব্যাঙ্গালোরের মতো হায়দরাবাদেও সাম্প্রদায়িকতার আগুনে হাওয়া দিচ্ছেন। তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর কার্যক্রম গ্রহণ করা হোক।
উৎস–আর্য সমাজের ইতিহাস ডঃ সত্যকেতু বিদ্যালঙ্কার, ভাগ ্ পৃষ্ঠা সংখ্যা ২৬৩–২৬৫
সৌদি আরবে সত্যার্থ প্রকাশ রাখার অপরাধে যখন এক আর্যের জেল হলো
0
June 30, 2026
Tags
