✅ পৌরোহিত্য/ঋত্বিককর্মে কার অধিকার❓
বৈদিক-পৌরাণিক-তান্ত্রিক সর্বমতে একক সিদ্ধান্ত পরে যাজন অর্থাৎ পৌরোহিত্য বা ঋত্বিককর্ম একমাত্র ব্রাহ্মণেরই বৃত্তি। অপবাদরূপে স্থানবিশেষে ক্ষত্রিয়-বৈশ্য কার্যসমাধা করতে পারবেন বটে, কিন্তু মুখ্যত কোনোক্রমেই ব্রাহ্মণ ব্যতীত কারো বৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। মনে রাখতে হবে যজন = যজ্ঞ করা উপনীত মাত্রের অধিকার ও নিত্যকর্ম। কিন্তু যাজন = অন্যের যজ্ঞ করানো অর্থাৎ পৌরোহিত্য; পৌরোহিত্য-কর্ম উপনয়ন নিলেও সবার অধিকার নয়, কেবল ব্রাহ্মণাধিকার। বিশেষত, মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী মহাভাগের গুণ-কর্ম অনুযায়ী বর্ণাশ্রম সিদ্ধান্তের যারা অনুসারী তাদের মধ্যে দ্বিজমাত্রে পৌরোহিত্যবৃত্তির অধিকারী হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ ভগবৎপাদ ব্রাহ্মণের বৃত্তি সম্পর্কে বলেছেন—
(১) অধ্যাপনমধ্যয়নং যজনং যাজনং তথা।
দানং প্ৰতিগ্ৰহশ্চৈব ব্রাহ্মণানামকল্পয়ৎ ॥১॥ মনু০ [১.৮৮]
= ব্রাহ্মণদের অধ্যয়ন, অধ্যাপনা, যজ্ঞ করা ও করানো, দান দেওয়া এবং দান গ্রহণ ছয়টি কর্ম। কিন্তু ‘প্রতিগ্রহঃ প্রত্যবরঃ’ মনু০ [১০.১০৯] অর্থাৎ প্রতিগ্রহ=দান নেওয়া হীনকর্ম।
[সূত্র: সত্যার্থপ্রকাশ, ৪র্থ সমুল্লাস]
(২) অধ্যাপন করা, যজ্ঞ করানো ও দান গ্রহণ করা ব্রাহ্মণের জীবিকা... অধ্যাপন করে ও যজ্ঞ করিয়ে জীবিকা অর্জন করা উত্তম কর্ম।
[সূত্র: সংস্কারবিধিঃ, গৃহস্থাশ্রমপ্রকরণম্, অথ ব্রাহ্মণস্বরূপলক্ষণম্]
▪️ঋত্বিকদের লক্ষণ সম্পর্কে মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী লিখেছেন—
(১) উৎকৃষ্ট বিদ্বান, ধার্মিক, জিতেন্দ্রিয়, কর্মকুশল, নির্লোভ, পরোপকারী, দুর্ব্যসনশূন্য, কুলীন, সুশীল, বৈদিক মতাবলম্বী ও বেদবিৎ-এমন এক, দুই, তিন বা চারজনকে ঋত্বিক পদে বরণ করবে। [সংস্কারবিধিঃ, সামান্যপ্রকরণম্]
(২) ধর্মাত্মা ও বিদ্বান ব্যক্তিকে ঋত্বিক, হোতা, অধ্বর্যু ও ব্রহ্মার পদে বরণ করবে। [সংস্কারবিধিঃ, গৃহস্থাশ্রমপ্রকরণম্, শালাকর্মাদি]
(৩) ধর্মাত্মা, শাস্ত্রোক্ত বিধির পূর্ণ জ্ঞাতা, বিদ্বান, সদ্ধর্মী, কুলীন, নির্ব্যসনী, সুশীল, বেদপ্রিয়, পূজনীয় এবং সর্বোপকারী গৃহস্থ- এটিই পুরোহিত সংজ্ঞা। [সংস্কারবিধিঃ, জাতকর্মপ্রকরণম্]
(৪) তারপর সুপাত্র বেদবিৎ ধার্মিক হোতাদি সপত্নীক ব্রাহ্মণ,... [সংস্কারবিধিঃ, গৃহস্থাশ্রমপ্রকরণম্, শালাকর্মাদি]
▪️ঋত্বিক মূখ্যত গৃহস্থ সপত্নীক ব্রাহ্মণই হবে—
যে দেবানামৃত্বিজো যে চ যজ্ঞিয়া যেভ্যো হব্যং ক্রিয়তে ভাগধেয়ম্।
ইমং যজ্ঞং সহ পত্নীভিরেত্য যাবন্তো দেবাস্তবিষা মাদয়ন্তাম্ ॥
অথর্ববেদ ১৯.৫৮.৬
= যাঁরা প্রজ্ঞাবানদের পুরোহিত, এবং যাঁরা সম্মানের যোগ্য, এবং যাঁদের জন্য যজ্ঞের হবির অংশ বরাদ্দ করা হয়েছে, সেই সমস্ত প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি যেন তাঁদের স্ত্রীদের সাথে এই যজ্ঞে আগমন করেন এবং পরমানন্দ করেন।
▪️অবিদ্বান, মূর্খ ঋত্বিকে যজ্ঞের বিনাশ হয়—
যদ্ বৈ যজ্ঞেঽকুশলা ঋত্বিজো ভবন্ত্যচরিতিনো ব্রহ্মচর্যমপরাগ্যা বা, তদ্ বৈ যজ্ঞস্য বিরিষ্টমিত্যাচক্ষতে। যজ্ঞস্য বিরিষ্টমনু যজমানো বিরিষ্যতে। যজমানস্য বিরিষ্টমন্বৃত্বিজো বিরিষ্যন্তে। ঋত্বিজাং বিরিষ্টমনু দক্ষিণা বিরিষ্যন্তে। দক্ষিণানাং বিরিষ্টমনু যজমানঃ পুত্রপশুভির্বিরিষ্যতে। পুত্রপশূনাং বিরিষ্টমনু যজমানঃ স্বর্গেণ লোকেন বিরিষ্যতে। স্বর্গস্য লোকস্য বিরিষ্টমনু তস্যার্থস্য যোগক্ষেমো বিরিষ্যতে, যস্মিন্নর্ধে যজন্ত ইতি ব্রাহ্মণম্॥
গোপথ ব্রাহ্মণ ১।১।১৩
= যে যজ্ঞে অদক্ষ ঋত্বিকেরা থাকেন ~ যাঁরা ব্রহ্মচর্য পালনে অপারগ, সে যজ্ঞ বিনাশপ্রাপ্ত হয়। যজ্ঞবিনাশহেতু যজমানেরও বিনাশ হয়। যজমানের বিনাশহেতু ঋত্বিকদেরও বিনাশ হয়। ঋত্বিকেরা বিনষ্ট হন বলে দক্ষিণাও নাশপ্রাপ্ত হয়। দক্ষিণা নাশ প্রাপ্ত হওয়ায় যজমানের প্রজা-পশু ধ্বংস হয়। প্রজা-পশু ধ্বংস হওয়ার কারণে যজমানের সুখ ও মুক্তি প্রাপ্তি ঘটে না। যজমানের সুখপ্রাপ্তি না হওয়ার দরুণ যজমানের অর্ধেক যোগক্ষেম বিনষ্ট হয়, যে অর্ধে তাঁরা যাগ করেন-একথাই বলছে ব্রাহ্মণগ্রন্থ।
🔰ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্র সকলেরই যজ্ঞ করার অধিকার রয়েছে। শূদ্রাদি সংজ্ঞা জন্ম-জাতিমূলক নয়, বরং গুণ, কর্ম, স্বভাবানুসারী। প্রত্যেকেরই যজ্ঞের অধিকার রয়েছে, অতএব অধিকারের কারণে সকলেরই যোগ্যতা লাভ করা উচিত। শূদ্রেরও যজ্ঞ করা উচিত। যজ্ঞের দ্বারা সব প্রকার উন্নতি হয়, এমনটাই যজুর্বেদের অষ্টাদশ অধ্যায়ে বর্ণিত রয়েছে। উন্নতি করার অধিকার সবার আছে। বিদ্বানদের সঙ্গ লাভ করা, তাঁদের সৎকার করা, দান আদি শুভকর্ম করা সবারই অধিকার, অতএব বেদের পরম্পরাতে একমাত্র মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীই শূদ্রদেরও যজ্ঞের অধিকার পুনর্বার প্রদান করে তাঁদের উন্নত হওয়ার ও করার মার্গ প্রশস্ত করেছেন। তিনি 'সংস্কারবিধিঃ'-তে লিখেছেন যে—
“সব সংস্কারে মধুর স্বরে মন্ত্রোচ্চারণ যজমান নিজেই করবে... যজমান যদি পড়তে না জানে তবে এই মন্ত্র গুলো সে নিজেই পড়বে । যদি কোন কার্যকর্তা জড়, মন্দমতি, অকাঠমূর্খ হয় তবে সে শূদ্র। শূদ্র মন্ত্র উচ্চারণে অসমর্থ হলে পুরোহিত ও ঋত্বিক মন্ত্র উচ্চারণ করবে, কিন্তু কর্ম সেই মূর্খ যজমানকে দিতেই করাবে।” [সংস্কারবিধিঃ, সামান্যপ্রকরণম্]
↘️ সুতরাং সপত্নীক বিদ্বান ব্রাহ্মণ তথা গৃহস্থ ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণীই পৌরোহিত্যকর্মের অধিকারী। অপবাদরূপে বিশেষ ব্যতিক্রমে ব্রহ্মচর্যাশ্রমী বা বানপ্রস্থী ক্ষত্রিয়-বৈশ্য করাতে পারলেও তা ব্যতিক্রম হিসেবেই ধরতে হবে, সর্বজনীন নয়। দ্বিমাত্রেই অর্থাৎ উপনয়ন নিয়ে উপনীত হলেই পৌরোহিত্যের অধিকার জন্মায় না। উপনীত ব্যক্তি নিজের নৈমিত্তিক বা বিশেষ যজ্ঞ কিছু নিজে করতে পারবেন। কিন্তু বিশেষ যাগ বা সংস্কারে ঋত্বিক অবশ্যই লাগবে। পাশাপাশি যেহেতু যাজনবৃত্তি ব্রাহ্মণেরই আজীবিকা সুতরাং মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীর বর্ণাশ্রমের যে গুণ-কর্মভিত্তিক সিদ্ধান্ত সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই ব্রাহ্মণের গুণাবলি যার মধ্যে আছে তাকেই 'ব্রাহ্মণ' সিদ্ধান্তে পৌরোহিত্যের অধিকারী করতে হবে। এই বিষয়ে সর্বজনীন নিয়ম ও যোগ্যতা পরীক্ষাপূর্বক কেন্দ্রীয়ভাবে নিবন্ধিত করে ঋত্বিককর্মে নিয়োজনের অনুমতি দান করা শ্রেয়।
🖋 শ্রী দীপংকর সিংহ দীপ
ব্যাকরণ-বেদান্ত-স্মৃতি-পৌরোহিত্য-আয়ুর্বেদতীর্থ
শিক্ষা ও শাস্ত্রার্থ সমন্বয়ক
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর
