✅ আর্যসমাজীদের রাজনৈতিক দলে প্রবেশ করা কি উচিত❓
▪️ পদবাক্যপ্রমাণজ্ঞ মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিত ব্রহ্মদত্ত জিজ্ঞাসু
▪️স্বামী শ্রদ্ধানন্দ সরস্বতী
❝আমাদের অত্যন্ত স্পষ্ট ঘোষণা করতে হবে যে, একজন আর্যসমাজী যদি কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ কিংবা জনসঙ্ঘে যোগদান করেন, তবে সেই সকল সংস্থার কোন্ কোন্ আদর্শ বা নির্দেশ তাঁর পক্ষে কস্মিনকালেও মান্য করা
আর্য সমাজের অতীত ইতিহাসই এর সাক্ষী যে, এর সূত্রপাত বা আরম্ভই হয়েছিল মহৎ আত্মবলিদানের মধ্য দিয়ে। এর বলিদানের সংখ্যা এবং গুরুত্ব অত্যন্ত মহান। এতে প্রাণ উৎসর্গকারীদের এক সুবিশাল ইতিহাস রয়েছে। আর্য সমাজের দেওয়া দ্বিতীয় মহৎ বলিদানটি ছিল এই যে, এটি ব্রিটিশ সরকারের চরম কোপানলের শিকার (কোপভাজন) হয়েছিল। বিপ্লবীদের বা বিদ্রোহীদের তালিকায় প্রতিটি আর্যসমাজীর নাম অন্তর্ভুক্ত থাকত। আর্য সমাজের মহাবিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ণ হওয়া বি.এ. এবং এম.এ. ডিগ্রিধারীদের ‘বাগী’ বা রাষ্ট্রদ্রোহী গণ্য করে সরকারি চাকরিতে নেওয়া হতো না। এতদসত্ত্বেও, ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে দয়ানন্দ অ্যাংলো-বৈদিক (ডি.এ.ভি.) কলেজ কখনো কোনো প্রকার আর্থিক সাহায্য বা অনুদানের (Aid) ভিক্ষা প্রার্থনা করেনি। গুরুকুল কাংড়ী কিংবা বৃন্দাবন আদি পবিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্নাতকদের খোঁজ নেওয়ার মতো তৎকালীন সমাজে কেউ ছিল না। স্বর্গীয় স্বামী শ্রদ্ধানন্দ, মহাত্মা হংসরাজ, আচার্য রামদেব জী, স্বামী আত্মানন্দ জী, মহাশয় কৃষ্ণ, মহাত্মা আনন্দ সরস্বতী জী, বক্সী টেকচাঁদ জী, পণ্ডিত বুদ্ধদেব জী বিদ্যালঙ্কার, পণ্ডিত ভগবদ্দত্ত জী, রাজগুরু ধুরেন্দ্র শাস্ত্রী, বাবু মদনমোহন শেঠ, শ্রী ঘনশ্যাম সিং গুপ্ত প্রমুখ আর্য সমাজের পরম যোগ্য কর্মী ও দেশের গভীর চিন্তাবিদগণ কখনো কংগ্রেসেও যাননি, আর না গিয়েছেন কোনো বিধানসভায় (অ্যাসেম্বলিতে)। তাঁরা অনায়াসেই যেতে পারতেন, কিন্তু যাননি। আর্য সমাজের এই মহান ত্যাগ বৈদিক সিদ্ধান্তের প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা এবং অচলা আস্থারই পরিচায়ক; যার কারণে এই সমাজ বা এই সমাজের নিষ্ঠাবান কর্মীবৃন্দ জাগতিক খ্যাতি কিংবা আর্থিক লাভকে সর্বদা পদাঘাত বা ঠুকরে এসেছেন এবং কখনো সেই পথে পা বাড়াননি। আর্য সংস্কৃতিরক্ষার স্বার্থে এই আত্মত্যাগকে কোনোমতেই সামান্য বলা চলে না।
এই বিষয়টিকে ঝুলিয়ে বা লটকে রাখা মোটেও সমীচীন নয়। এই প্রসঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ভারতের ভবিষ্যৎ যেমনই হোক না কেন—কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা, সঙ্ঘ, সোশালিস্ট কিংবা কমিউনিস্ট যে কেউ (ভাগ্যবশত কিংবা দুর্ভাগ্যবশত) সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে ভারতের শাসনভার পরিচালনা করুক না কেন, আর্য সমাজকে এই সমস্ত পরিস্থিতিতেই এদের সকলের যাবতীয় মন্দের হাত থেকে (বিশ্বশান্তির মহান ভাবনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে) দেশকে রক্ষা করতে হবে।
আর্য সমাজ কি একজন সন্ন্যাসীর ন্যায় চলবে, নাকি একজন ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের ন্যায়? এই গুরুতর ও গম্ভীর সমস্যাটি বর্তমানে আর্য সমাজের সামনে যেভাবে এসে উপস্থিত হয়েছে, তা পূর্বে কখনো হয়নি। স্বাধীন ভারতের বুকে এই বিষয়ে আমাদের নিজস্ব একটি সুনির্দিষ্ট ও দৃঢ় ধারণা গড়ে তুলতে হবে।
উপর্যুক্ত রাজনৈতিক বা সামাজিক সংস্থাগুলোর কোনোটিই আর্য সমাজকে বিকশিত বা পল্লবিত হতে দিতে চায় না। যে আর্য সমাজের কাঁধে চড়ে এই সংস্থাগুলো দূরবর্তী বস্তু দেখতে সমর্থ হয়েছে বা নিজেদের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে, সেই আর্য সমাজকেই তারা আজ পিছনে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে চায় কিংবা ধোঁকা দিতে চায়। প্রকৃতপক্ষে, আর্য সমাজ তো ‘আর্য রাষ্ট্র’ বা ‘আর্য রাজ্য’-এর পবিত্র ভাবনায় অনুপ্রাণিত; এটি সুশাসন (সুরাজ্য) চায় এবং স্বশাসন (স্বরাজ্য) চায়—ভারতীয়তাহীন বা সংস্কৃতিশূন্য কোনো স্বরাজ্য সে কস্মিনকালেও চায় না।
↗️ আর্য সমাজ রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করবে কি করবে না?
আর্য সমাজের সংগঠন যদি অত্যন্ত সুদৃঢ় হয়, তবে যেকোনো আর্যসমাজী সরাসরি আর্য সমাজের পক্ষ থেকেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে অ্যাসেম্বলি বা বিধানসভার জন্য তিনি কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা কিংবা জনসঙ্ঘের প্রতীক নিয়ে দাঁড়াতে পারেন; তবে তাঁকে এই মর্মে শপথ গ্রহণ করতে হবে যে—তিনি আর্য সমাজের মূল সিদ্ধান্ত বা ভাবনার বিরুদ্ধে কখনো ভোট দেবেন না। যদি তেমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে পদত্যাগপত্র (ইস্তফাপত্র) জমা দেবেন। যিনি এই ধরনের কঠোর শপথ গ্রহণ করবেন, একমাত্র তাঁকেই যেন ভোট দেওয়া হয়; কারণ আর্য সমাজের যদি স্বতন্ত্রভাবে লড়াই করার মতো পর্যাপ্ত শক্তি না থাকে, তবে তাকে কোনো না কোনো পক্ষের সাথে যুক্ত হতেই হবে।
আমাদের এটি সুদৃঢ় অভিমত যে—নির্বাচনে প্রার্থী অবশ্যই দাঁড় করানো হোক, তা তাঁরা যেখান থেকেই দাঁড়ান না কেন; যৌথ বা সমষ্টিগত রূপেই হোক অথবা ব্যক্তিগত রূপেই হোক। বর্তমান সময়ে রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক বা প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হওয়ায় এই বিষয়টি অত্যন্ত গম্ভীর আকার ধারণ করেছে। আর্য সমাজকেও এই বিষয়ে চরম গাম্ভীর্যের সাথেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। আর্যসমাজী ব্যক্তিরা যেন নির্বাচনে অবশ্যই, অবশ্যই অংশগ্রহণ করেন।
এখানে আমাদের এটিও বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে যে, আর্য সমাজের সামনে এমন এক পরিস্থিতিরও উদ্ভব হতে পারে—যখন তাকে ‘সাম্প্রদায়িক’ ঘোষণা করে ব্রিটিশ রাজত্বের চেয়েও অনেক বেশি তার স্বাধীন কার্যাবলিতে বাধা সৃষ্টি করা হতে পারে। এই সমস্ত কিছুই স্রেফ ‘সাম্প্রদায়িকতা’-র নাম করে করা হতে পারে। কারণ আর্য সমাজের সাথে এদের কারোরই আদর্শিক মিল নেই; অথচ একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সমাজ হিসেবে একে সকলেই মনে মনে স্বীকার করে। প্রত্যেকেই এর থেকে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে চায়, কিন্তু এর নীতি বা আদর্শকে কেউ মেনে চলতে চায় না। এটি এক অত্যন্ত বিচিত্র ও জটিল সমস্যা, যা একমাত্র আর্য সমাজকেই অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে সমাধান করতে হবে।
📍 পণ্ডিত ব্রহ্মদত্ত জিজ্ঞাসু
আর্য সমাজ মানবজীবনের চারটি আশ্রমে (ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস) পূর্ণ বিশ্বাস রাখে। রাজনীতি হলো মূলত গৃহীদের কর্তব্যেরই একটি অঙ্গমাত্র। সমগ্র পৃথিবীর স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ—অসম্পূর্ণ রূপেই হোক না কেন—আসলে ব্রহ্মচর্যাশ্রমেরই এক একটি প্রতীক। জগতের সমস্ত সমাজ-সংস্কারক এবং দার্শনিক, যাঁরা সংসারের যাবতীয় জটিলতা ও মোহ থেকে মুক্তি লাভ করে নিজেদের সম্পূর্ণ ধ্যান জন্ম এবং মৃত্যুর গূঢ় রহস্যের ওপর কেন্দ্রিকৃত করেন, তাঁরা সকলেই মূলত বানপ্রস্থী। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রকৃত সন্ন্যাসী কে? জনকল্যাণে নিয়োজিত ধর্মসভাগুলোই হলো প্রকৃত সন্ন্যাসী; কারণ তাদের পরম কর্তব্য হলো মানুষকে সম্পূর্ণ নির্ভীক করে তুলে পরম সত্যের পথে (সৎপথগামী) পরিচালিত করা। আর্য সমাজ তার প্রাতিষ্ঠানিক বা সাঙ্গঠনিক রূপে স্বয়ং একজন সন্ন্যাসী; আর ঠিক এই কারণেই রাজনীতির সাথে তার প্রত্যক্ষ কোনো সম্পর্ক নেই। যদি আর্য সমাজ কখনো সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করে, তবে তা করে সে প্রকারান্তরে গৃহস্থদের নিজস্ব কর্মক্ষেত্রেই অনধিকার হস্তক্ষেপ করবে।
📍 স্বামী শ্রদ্ধানন্দ সরস্বতী
© দীপংকর সিংহ দীপ
