সত্যার্থ প্রকাশে লুই জ্যাকোলিও-এর Bible in India গ্রন্থের উল্লেখ : স্বামী দয়ানন্দের বিশ্বব্যাপী সচেতনতার প্রমাণ

✅সত্যার্থ প্রকাশে লুই জ্যাকোলিও (Louis Jacolliot)-এর Bible in India গ্রন্থের উল্লেখ : স্বামী দয়ানন্দের বিশ্বব্যাপী সচেতনতার প্রমাণ
 
মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী তাঁর ‘সত্যার্থ প্রকাশ’ গ্রন্থের প্রথম সংস্করণে (প্রকাশকাল ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দ) একাদশ সমুল্লাসে লুই জাকোলিও [জ্যাকোলিওট] (Louis Jacolliot)-র "বাইবেল ইন ইন্ডিয়া" নামক গ্রন্থের উদ্ধৃতি প্রদান করেছেন। তিনি লিখেছেন— "একজন জ্যাকোলিওট সাহেব পূর্বে এরূপ সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত করেছেন যে, সমগ্র ভূখণ্ডে যত প্রকার বিদ্যা বা মতবাদ বিস্তৃত হয়েছে, সেই সমস্তই আর্যাবর্ত (ভারত) থেকেই গ্রহণ করা হয়েছে।"
লুই জাকোলিও (১৮৩৭–১৮৯০ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন ফ্রান্সের নাগরিক এবং তিনি এই গ্রন্থটি মূল ফরাসি ভাষায় ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে সেই সময়ে রচনা করেছিলেন, যখন তিনি ভারতের চন্দননগরে ফরাসি উপনিবেশের ‘চিফ জাস্টিস’ (প্রধান বিচারপতি) পদে কর্মরত ছিলেন।
সেই সময়ে স্বামী দয়ানন্দ জী গঙ্গা তীরবর্তী অঞ্চলসমূহে বৈদিক ধর্মপ্রচারে লিপ্ত ছিলেন এবং ধীরে ধীরে খ্যাতি লাভ করছিলেন। কাশীর সেই ঐতিহাসিক শাস্ত্রার্থ তখনও সংঘটিত হয়নি। জাকোলিও-র এই গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়; আর এটি সেই একই বছর, যে বছর স্বামী দয়ানন্দের ঐতিহাসিক কাশী শাস্ত্রার্থ সম্পন্ন হয়েছিল।
জাকোলিও রচিত মূল ফরাসি গ্রন্থটির নাম ছিল— "La Bible dans l'Inde: vie de Iezeus Christna", যার ইংরেজি অনুবাদ "Bible in India" শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সময়ে স্বামী দয়ানন্দ জী ইংরেজি ভাষার সাথে একেবারেই পরিচিত ছিলেন না, তবুও মাত্র ৫-৬ বছর পূর্বে প্রকাশিত এই সমকালীন বৈপ্লবিক গ্রন্থের পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য তাঁর জানা ছিল—এটি অত্যন্ত বিস্ময়কর একটি বিষয়। এটি সগৌরবে প্রমাণ করে যে, একজন সংস্কৃতের মহাপণ্ডিত এবং পরিব্রাজক সন্ন্যাসী হিসেবে দেশজুড়ে নিরন্তর ভ্রমণরত থেকেও তিনি বৈশ্বিক ও আন্তর্জাতিক বৌদ্ধিক আলোড়ন সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন ও জাগ্রত ছিলেন। কোনো বিদেশী লেখক কর্তৃক বৈদিক ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রশংসায় রচিত গ্রন্থের সন্ধান তাঁর জানা থাকা—তাঁর সেই বিলক্ষণ ও অসাধারণ বিশ্ব-সচেতনতারই এক জ্বলন্ত প্রমাণ।
সত্যার্থ প্রকাশের দ্বিতীয় পরিমার্জিত ও সংশোধিত সংস্করণেও (প্রকাশকাল ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দ) মহর্ষি দয়ানন্দ জী এই একই বিদেশী লেখকের উল্লেখ করে লিখেছেন— "দেখো! একজন জাকোলিও সাহেব, প্যারিস তথা ফ্রান্স দেশের নিবাসী, স্বীয় ‘বাইবেল ইন ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে লিখেছেন যে—সমগ্র বিদ্যা ও কল্যাণের একমাত্র ভাণ্ডার হলো এই আর্যাবর্ত দেশ; এবং সমস্ত বিদ্যা ও মতবাদ এই দেশ থেকেই সর্বত্র বিস্তৃত হয়েছে। তিনি পরমেশ্বরের কাছে এই প্রার্থনাও করেছেন যে—‘হে পরমেশ্বর! প্রাচীনকালে আর্যাবর্ত দেশের যেমন সর্বাঙ্গীণ উন্নতি ছিল, ঠিক তেমনই উন্নতি আমাদের দেশেরও করুন’—উক্ত গ্রন্থে তা দেখে নাও।" (১১শ সমুল্লাস)
এই ইংরেজি গ্রন্থ ‘Bible in India’-র সর্বপ্রথম হিন্দি অনুবাদ করেছিলেন শ্রী সন্তরাম জী, বি.এ.; যার উপোদ্ঘাত বা ভূমিকা লিখেছিলেন ভারতের বিখ্যাত বিপ্লবী ভাই পরমানন্দ জী। এই গ্রন্থের অপর একটি সংক্ষিপ্ত হিন্দি অনুবাদ ড. ভবানীলাল ভারতীয় জী কর্তৃক সম্পাদিত হয়েছিল, যা সংবৎ ২০৬৩-তে হিন্দোন থেকে প্রকাশিত হয়।
এখানে স্বর্গীয় ভাই পরমানন্দ কর্তৃক লিখিত সেই ঐতিহাসিক উপোদ্ঘাত (প্রস্তাবনা) উপস্থাপন করা হলো, যা শ্রী সন্তরাম জী কৃত হিন্দি অনুবাদের সাথে প্রকাশিত হয়েছিল। এর মাধ্যমে কেবল লুই জাকোলিও-র মতো একজন বিদেশী বিচারকের এই গুরুত্বপূর্ণ কীর্তির বিশেষত্বই স্পষ্ট হবে না, বরং এটিও সহজবোধ্য হবে যে—স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী কেন সত্যার্থ প্রকাশের মতো বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থে এর উদ্ধৃতি প্রদান করেছিলেন।
• স্বর্গীয় ভাই পরমানন্দ কর্তৃক লিখিত উপোদ্ঘাত (প্রস্তাবনা) •
শ্ৰীযুত সন্তরাম জী কর্তৃক অনূদিত এই পুস্তকটি হিন্দুজাতির জন্য এক বিশেষ ও অনন্য তাৎপর্য বহন করে। মূল গ্রন্থের লেখক, শ্রীযুত জাকোলিও, ছিলেন সেই ফরাসি জাতির এক উজ্জ্বল রত্ন, যা ইউরোপে সত্যনিষ্ঠা এবং সাম্যের মতো উচ্চ ভাবাদর্শের প্রতি অনুরাগের জন্য বিশেষভাবে সুপরিচিত। ইউরোপ মহাদেশে কেবল ফরাসিরাই এমন এক অনন্য জাতি, যাঁরা পৃথিবীর অন্যান্য জাতি এবং তাদের প্রাচীন ঐতিহ্য ও পৌরাণিক গাথাকে ঠিক ততখানিই সমাদর ও সম্মানের দৃষ্টিতে দেখেন, যতখানি নিজেদের জাতি ও নিজেদের ইতিহাসকে দেখে থাকেন। ফরাসি হওয়ার কারণে শ্রীযুত জাকোলিও-র হৃদয় ছিল সম্পূর্ণ বিশাল, উন্মুক্ত ও উদার। তিনি নিজের দেশের উচ্চকোটির পণ্ডিতদের অন্যতম ছিলেন। এই যোগ্যতার কারণেই তিনি চন্দননগরের ফরাসি উপনিবেশে প্রধান বিচারপতির (ন্যায়াধীশ) পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন। তিনি হিন্দুজাতির প্রাচীন ইতিহাসকে ঠিক সেই দৃষ্টিতেই দেখার আন্তরিক প্রয়াস করেছিলেন, যে দৃষ্টিতে স্বয়ং হিন্দুরা নিজেদের গৌরবময় অতীতকে দেখতে অভ্যস্ত।
আজকের দিনে ইংরেজি শিক্ষার প্রচ্ছন্ন প্রভাবে আমাদের নয়নযুগল এমন এক ধাঁধায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে যে, আমরা নিজেদের জাতির প্রাচীন গৌরব ও মহিমাকে হৃদয় থেকে অনুভব ও সম্মান করতে পারছি না। আমাদের অনেক ভাই বর্তমান পাশ্চাত্য শিক্ষার মোহে এতটাই অন্ধ ও উন্মত্ত হয়ে উঠেছেন যে, নিজেদের প্রাচীন শ্রেষ্ঠত্বের কথাগুলো তাঁদের কাছে নিছক ‘কপোলকল্পিত’ বা অলীক গল্প বলে মনে হয়। অতএব, আমাদের অত্যন্ত বিস্ময় হয় এটি দেখে যে—কীভাবে একজন বিদেশী বিদ্বান সেই সমস্ত বিষয়কে, যা আমাদের কাছে কেবলই এক চিরন্তন স্বপ্নরাজ্যের মতো অবাস্তব ঠেকে, সেগুলোকে পরম সত্য বলে মান্য করছেন এবং অত্যন্ত জোরালো যুক্তি দিয়ে তা বিশ্ববাসীকে মানাতে উদ্যত হচ্ছেন!
এটি হতেই পারে যে, শ্রীযুত জাকোলিও-র সমস্ত ভাবনার সাথে আমরা সম্পূর্ণ একমত হতে পারলাম না, অথবা আমরা হয়তো এটি মনে করতে পারি যে—তিনি এই বৈদিক দর্শনের ওপর এতটাই মুগ্ধ ও মোহিত হয়েছিলেন যে, এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কোথাও কোথাও কিছুটা অত্যুক্তির আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই যে, শ্রী জাকোলিও-র বিচার ও কল্পনা নিজ বিষয়ে সর্বতোভাবে অভূতপূর্ব, অনন্য ও মৌলিক। এগুলোকে ‘অসত্য’ বলার সাহস কেবল সেই ব্যক্তিই দেখাতে পারেন, যিনি মনে করেন যে হিন্দুজাতির অতীত ইতিহাসটি ছিল মূলত এক অসভ্য ও বন্য জাতির মতো। আমরা যদি একবারের জন্যও এটি স্বীকার করে নিই যে—এই জাতির পূর্বপুরুষেরা সেই যুগে সভ্যতা অর্থাৎ সত্যজ্ঞান এবং সর্বপ্রকার বিদ্যার চরম শিখরে আরোহণ করেছিলেন, যখন ইউরোপের বর্তমান উন্নত জাতিগুলো ঘর তৈরি করা এবং পরিধেয় বস্ত্র পরিধান করার ন্যূনতম কৌশলও শেখেনি, তবে শ্রীযুত জাকোলিও-র এই তত্ত্ব বা চিন্তাধারা সম্পর্কে আমাদের সমস্ত বিস্ময় নিমেষেই দূর হয়ে যাবে। যেভাবে বর্তমানের অনুন্নত জাতিগুলোর অন্ধকার থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করা সম্ভব, ঠিক তেমনই এটিও সমানভাবে সম্ভব যে—এই মহান আর্যজাতি উন্নতির সর্বোচ্চ শিখর থেকে আজ অধঃপতিত হয়ে এমন এক চরম দুরবস্থার সম্মুখীন হয়েছে, যার ফলে তার নিজের অতীত গৌরবও আজ তার কাছে অলীক বা মিথ্যা বলে প্রতিভাত হচ্ছে।
শ্ৰীযুত জাকোলিও-র বিরোধী খ্রিস্টান পাদ্রিদের এটি ধারণা ছিল যে—দক্ষিণ ভারতের ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা তাঁর ওপর কোনো মায়াজাল বা যাদু বিস্তার করে তাঁকে এক প্রকার ভ্রম-জালে আবদ্ধ করে ফেলেছিলেন। এই সত্যটি স্বীকার করতে অবশ্য কোনো বাধা নেই যে, শ্রীযুত জাকোলিও-র সাথে তৎকালীন ভারতীয় ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের এক নিবিড় মেলবন্ধন ও যোগাযোগ ছিল। তিনি আর্যজাতির প্রাচীন অগ্রগতি ও উন্নতি সম্বন্ধীয় যাবতীয় জ্ঞান তাঁদের সংস্পর্শেই লাভ করেছিলেন। তিনি যদি এই পুণ্যভূমিতে এসে এই সকল ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের সান্নিধ্য লাভ না করতেন, তবে তিনি বাইবেল এবং মানব ধর্মশাস্ত্রের (মনুস্মৃতি) সত্যের তুলনামূলক বিচার করতে সমর্থ হতেন না এবং আমাদেরও এই কালজয়ী তুলনামূলক তত্ত্বের সাথে পরিচিত করাতে পারতেন না।
শ্ৰীযুত জাকোলিও কেবল বাইবেলের ওপরেই নিজের অনুসন্ধান বা গবেষণা সমাপ্ত করে দেননি। তিনি এটিও সপ্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, আজ সমগ্র ইউরোপ যে যিশু খ্রিস্টের (ক্রাইস্ট) পূজা করে, তিনি প্রকৃতপক্ষে শ্রীকৃষ্ণ ব্যতীত অন্য কেউ নন। যিশুর জন্মবৃত্তান্ত এবং অন্যান্য খ্রিস্টীয় ঐতিহাসিক অলৌকিক কাহিনিগুলো এমন—যা স্পষ্টভাবেই শ্রীকৃষ্ণের জন্মলীলা এবং অন্যান্য প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহাসিক আখ্যান থেকে হুবহু ধার করা বা গৃহীত বলে প্রতীয়মান হয়।
যদিও ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সের আরও অনেক পণ্ডিত সংস্কৃত ভাষা ও সংস্কৃত সাহিত্য অধ্যয়ন করেছেন এবং তাঁদের প্রাথমিক মনোভাবও সংস্কৃতের গৌরব তথা আর্য সভ্যতার পক্ষেই পরিলক্ষিত হয়; কিন্তু তাঁদের ওপর তাঁদের নিজ দেশের খ্রিস্টান পাদ্রি ও চার্চের প্রভাব এতটাই প্রবল প্রমাণিত হয়েছিল যে—তাঁরা নিজেদের হৃদয়ে অনুভূত সত্যকে প্রকাশ্যে স্বীকার করতেও চরম ভয় পেতেন। এবং যে ধর্মীয় আবহে তাঁদের জন্মলগ্ন থেকে লালন-পালন হয়েছে, যা তাঁদের সমাজ পরম আদরে গ্রহণ করেছে—তাকে অক্ষুণ্ণ রাখার নিমিত্তে তাঁরা এই পরম সত্যের সামনে প্রকাশ্যভাবে মস্তক অবনত করতে পারেননি। অধ্যাপক ম্যাক্সমুলারের মতো প্রথিতযশা সংস্কৃত পণ্ডিতও সবকিছু দেখেশুনে এবং জেনেও পাদ্রিদের এতটাই ভয় পেতেন যে, তিনি শেষ পর্যন্ত বাইবেলকেই পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তম ও পবিত্র গ্রন্থ বলতে বাধ্য হতেন। আমাদের দৃষ্টিতে একমাত্র জাকোলিও-ই এমন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব, যাঁর মনে নিজের দেশের ধর্মের প্রতি কোনো অন্ধ পক্ষপাত ছিল না এবং নিজের সমাজের কোনো প্রকার ভয় বা কুন্ঠাও ছিল না। তিনি সম্পূর্ণ মুক্তকণ্ঠে এক পরম সত্যকে স্বীকার করে নিজের দেশবাসীর সামনে তা সগৌরবে আলোয় আনার সাহস দেখিয়েছিলেন। তাই আমি আমার সমস্ত হিন্দু ভাইদের প্রতি এটি সনির্বন্ধ অনুরোধ করা অত্যন্ত আবশ্যক মনে করি যে—তাঁরা এই অদ্ভুত ও অসাধারণ বইটি কেবল নিজেরা পাঠ করেই ক্ষান্ত হবেন না, বরং অপরের মধ্যেও এর ব্যাপক প্রচার ও প্রসার ঘটাবেন।
— ভাই পরমানন্দ
 
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.