স্বামী দয়ানন্দ ও রাজধর্ম

 

স্বামী দয়ানন্দ ও রাজধর্ম

ঊনবিংশ শতাব্দীর মহান দার্শনিক চিন্তক স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী ভারতবর্ষের হৃদয়ে আত্মনির্ভরতা, স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের চেতনা সঞ্চার করতে চেয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালের পূর্বের ভারত তো পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিলই, কিন্তু মহাভারত-পরবর্তী ভারত কুপ্রথারূপী পুতুলের মতো ছন্দহীন হয়ে পড়েছিল। স্বামী দয়ানন্দ জী তাঁর দূরদর্শী চিন্তার মাধ্যমে এই সকল কুপ্রথা (Malpractices) থেকে মানবজাতিকে মুক্ত করার প্রয়াস চালান। তিনি স্বরাজ, স্বধর্ম ও স্বভাষার আন্দোলন গড়ে তোলেন। অন্ধবিশ্বাস (Superstition), বহুদেববাদ (Pantheism/Polytheism), অস্পৃশ্যতা (Untouchability), বাল্যবিবাহ, সতীদাহ প্রথা, জাতিভেদ এবং বেদের নিরন্তর অবক্ষয়ের তীব্র বিরোধিতা করে তিনি বেদের প্রকৃত স্বরূপ, গুণ-কর্ম ভিত্তিক বর্ণ-ব্যবস্থা, পুনর্বিবাহ, নারী শিক্ষা, শূদ্রের অধিকার, অগ্নিহোত্র, একেশ্বরবাদ, গোরক্ষা ও কৃষিকার্যের জয়ধ্বনি দেন। এই ক্রমেই স্বামীজী 'রাজধর্ম' সম্পর্কেও নিজের সুচিন্তিত অভিমত ব্যক্ত করেন,

    "(ত্রীণি রাজানা) অর্থাৎ তিন প্রকার সভাকেই রাজা বলে গণ্য করা উচিত, কোনো একজন ব্যক্তিকে নয়। সেই তিনটি সভা হলো প্রথমত, রাজ্য পরিচালনার জন্য 'আর্য রাজসভা', যার দ্বারা বিশেষ করে সমস্ত রাষ্ট্রীয় কার্য সিদ্ধ হবে। দ্বিতীয়ত, 'আর্য বিদ্যাসভা', যার মাধ্যমে সকল প্রকার বিদ্যার প্রচার হবে। তৃতীয়ত, 'আর্য ধর্মসভা', যার দ্বারা ধর্মের প্রচার এবং অধর্মের বিনাশ হবে। এই তিন সভার মাধ্যমে (বিদথে) অর্থাৎ যুদ্ধে (পুরূণি পরিবিশ্বানি ভূষথঃ) সকল শত্রুকে জয় করে নানা প্রকার সুখের দ্বারা বিশ্বকে পরিপূর্ণ করা উচিত।"  [ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকা, রাজপ্রজাধর্মবিষয়]

সত্যার্থ প্রকাশে বলেছেন, 
ত্রীণি রাজানা বিদথে পুরূণি পরি বিশ্বানি ভূষথঃ সদাংসি ৷৷ ঋ০। ৩।৩৮।৬
ঈশ্বর উপদেশ দিচ্ছেন যে, (রাজানা) রাজা ও প্রজাবর্গ মিলিত হয়ে (বিদথে) সুখপ্রাপ্তি এবং বিজ্ঞানান্নোতি বিধায়ক রাজা-প্রজা বিষয়ক কর্মে (ত্রীণি সদাংসি) তিন সভা অর্থাৎ বিদ্যাৰ্য সভা, ধৰ্মাৰ্য সভা এবং রাজাৰ্য সভা গঠন করে (পুরূণি) বহুবিধ (বিশ্বানি) সমগ্র প্রজা সন্ধন্বীয় মনুষ্যাদি প্রাণীর (পরিভৃষথঃ) বিদ্যা, স্বাতন্ত্র্য, ধর্ম, সুশিক্ষা এবং ধনাদি দ্বারা সর্বপ্রকারে অলঙ্কৃত করবে।

স্বামীজী রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে একতন্ত্র (Autocracy) বা একনায়কতন্ত্রের (Dictatorship) সমর্থক ছিলেন না; তাঁর বক্তব্যে, 
'কোন এক ব্যক্তিকে  স্বতন্ত্র রাজ্যের অধিকার দেওয়া উচিত নয়। কিন্তু রাজা যিনি সভাপতি [- তার অধীন], [সভাপতি যিনি-] তার অধীন সভা, সভার অধীন রাজা, প্রজার অধীন রাজা ও সভা এবং রাজসভার অধীন প্রজাবর্গ থাকবে।' [সত্যার্থ প্রকাশ, ষষ্ঠ সমুল্লাস]
কারণ একজন ব্যক্তির সীমাবদ্ধতা থাকে, তিনি একাকী সমস্ত রাজকার্য সম্পাদন করতে পারেন না। তাই রাষ্ট্রীয় কার্যে সহায়তার জন্য তিনি বৈদিক ব্যবস্থানুযায়ী উক্ত তিনটি সমিতি বা সভা গঠনের বিধান দেন। স্বামীজীর অভিপ্রায় ছিল, এই সভাগুলো নিজ নিজ ক্ষেত্র সম্পর্কিত সকল সমস্যায় রাজাকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেবে এবং প্রজাস্বার্থে আইন কার্যকর করবে। এছাড়া স্বামীজী দুর্বল বা ভীরু শাসকের পক্ষপাতী ছিলেন না। তাঁর দৃষ্টিতে শাসক হবেন শক্তিশালী, বহুশ্রুত (জ্ঞানী), নিরপেক্ষ, বিদ্বান, শত্রুহন্তা এবং গুণী। নিজের অমর গ্রন্থ 'সত্যার্থ প্রকাশ'-এর ষষ্ঠ সমুল্লাসে স্বামীজী লিখেছেন

    "সমস্ত সেনাবাহিনী ও সেনাপতির ওপর রাজ্যাধিকার, দণ্ড প্রদানের ব্যবস্থার সকল কার্যের আধিপত্য এবং সকলের ওপর বর্তমান সর্বাধীশ রাজ্যাধিকারএই চারটি অধিকারে সম্পূর্ণ বেদ-শাস্ত্রে প্রবীণ, পূর্ণ বিদ্যাযুক্ত, ধর্মাত্মা, জিতেন্দ্রিয় ও সুশীল ব্যক্তিদের প্রতিষ্ঠিত করা উচিত। অর্থাৎ মুখ্য সেনাপতি, মুখ্য রাজ্যাধিকারী, মুখ্য বিচারপতি এবং রাজাএই চারজনকেই সকল বিদ্যায় পূর্ণ পণ্ডিত হতে হবে।"

স্বামী দয়ানন্দ জী কর্তৃক রাজা (President), প্রধান (Prime Minister), বিচারপতি (Judge) এবং সেনাপতি (Commander)-র জন্য নির্দেশিত যোগ্যতার মধ্যে সাধারণ প্রশাসন (General Administration), বিচার ব্যবস্থা (Judicature), দণ্ডবিধি (Penal Process) ও সামরিক শক্তির (Military Power) স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। স্বামীজীর রাজধর্মের বিচারধারা ছিল গণতান্ত্রিক (Democratic), কিন্তু তিনি অজ্ঞ ব্যক্তিদের সমষ্টির দ্বারা গৃহীত সিদ্ধান্তকে অগ্রাহ্য করার কথা বলেছেন। তিনি ধর্মানুকূল সিদ্ধান্তকেই গ্রহণীয় মনে করতেন। সংবিধান (Constitution) সম্পর্কে স্বামী দয়ানন্দের অভিমত হলো প্রজাস্বার্থে প্রণীত যেকোনো সংবিধান এমন দশ সদস্যের 'সংবিধান সভা' দ্বারা প্রস্তাবিত হওয়া উচিত যাঁরা বুদ্ধিমান ও বেদবিৎ হবেন। তাঁরা ভাষাবিদ ও তার্কিক হবেন। ঋক্, যজু ও সামবেদে পারদর্শী তিন পণ্ডিতের সম্মতিতে প্রস্তাবিত সংবিধানও জনগণের মান্য হওয়া উচিত। তবে উক্ত সদস্যদের ব্রহ্মচারী, গৃহস্থ বা বানপ্রস্থ হওয়া আবশ্যক। (Contribution of Arya Samaj in the Making of Modern India By Radhey Shyam Pareek, Pg. 232)

এখানে লক্ষণীয় যে, স্বামীজী বারবার চারিত্রিক শুদ্ধতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর ধারণা ছিল, চরিত্রবান ব্যক্তিই রাষ্ট্রনির্মাণে সার্থক সহযোগিতা করে রাজ্যকে সম্পন্ন করতে পারেন। তাই তিনি লিখেছেন "যথা রাজা তথা প্রজাঃ" অর্থাৎ রাজা যেমন হন, প্রজাও তেমন হয়। [সত্যার্থ প্রকাশ, ষষ্ঠ সমুল্লাস]

সভাপতি (President) এবং গুপ্তচরদের (CBI/CID/IB/RAW ইত্যাদি) বিষয়ে স্বামীজীর অভিমত হলো, "যিনি নিত্য ভ্রমণশীল সভাপতি হবেন, তাঁর অধীনে সকল গুপ্তচর বা দূতদের রাখা উচিত। যাঁরা রাজপুরুষ এবং সাধারণ প্রজাদের সঙ্গে নিত্য যোগাযোগ রাখেন এবং বিভিন্ন জাতির অন্তর্ভুক্ত হনতাঁদের মাধ্যমে রাজা সকল রাজপুরুষের দোষ ও গুণ গোপনে অবগত হবেন। যাঁদের অপরাধ থাকবে তাঁদের দণ্ড এবং যাঁদের গুণ থাকবে তাঁদের সম্মান সর্বদা প্রদান করবেন।" (সত্যার্থ প্রকাশ, ষষ্ঠ সমুল্লাস)

মন্ত্রিপরিষদ (Cabinet Council) সম্পর্কে স্বামী দয়ানন্দের রায়:
স্বামীজীর মতে, রাজার উচিত সাত বা আটজন ন্যায়প্রিয়, বেদশাস্ত্রজ্ঞ, কর্মঠ, নির্লোভ ও সম্ভ্রান্ত সজ্জন পণ্ডিতকে মন্ত্রিপদে নিযুক্ত করা। এই প্রসঙ্গে তিনি 'সত্যার্থ প্রকাশ'-এ লিখেছেন
    "স্বরাজ্যে উৎপন্ন, বেদাতি শাস্ত্রে পারদর্শী, শূরবীর, যাঁদের লক্ষ্য বা বিচার বিফল হয় না এবং কুলীন ও সুপরীক্ষিত সাত বা আটজন উত্তম ধার্মিক চতুর 'সচিবান' অর্থাৎ মন্ত্রী নিয়োগ করা উচিত।" [সত্যার্থ প্রকাশ, ষষ্ঠ সমুল্লাস]

স্বামীজীর মতে, রাজা ও প্রজা পরস্পরের সঙ্গে পিতা ও পুত্রের ন্যায় আচরণ করবেন এবং একে অপরের সহায়ক হবেন। রাজা জনমানুষের সমস্যার নিয়মমাফিক নিরসন করবেন এবং প্রজা রাষ্ট্রহিতৈষী নিয়মগুলো পালন করবেন। তিনি লিখেছেন,
    "... কারণ প্রজা ধনাঢ্য, আরোগ্য এবং পান-ভোজনে সম্পন্ন থাকলে রাজার উন্নতি হয়। প্রজাকে নিজ সন্তানের ন্যায় সুখ দেবেন এবং প্রজা রাজাকে পিতার ন্যায় জ্ঞান করবেন। এটি ধ্রুব সত্য যে রাজাদের রাজা হলেন কৃষক ইত্যাদি পরিশ্রমী মানুষ এবং রাজা তাঁদের রক্ষক মাত্র। যদি প্রজাই না থাকে তবে রাজা কার? আর যদি রাজা না থাকে তবে প্রজাই বা কার বলাবে? উভয়ই নিজ নিজ কাজে স্বতন্ত্র এবং প্রীতিযুক্ত কার্যে পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল থাকবেন। প্রজার সাধারণ সম্মতির বিরুদ্ধে রাজা বা রাজপুরুষ যেন না হন, আবার রাজার আজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রজা যেন না চলে।" [সত্যার্থ প্রকাশ, ষষ্ঠ সমুল্লাস]

এখানেই শেষ নয়, স্বামীজী উক্ত সমুল্লাসে আঠারোটি বিবাদযুক্ত কর্ম চিহ্নিত করে সেগুলোর ওপর নিয়ম বাঁধার নির্দেশ দিয়েছেন। সেই কর্মগুলো হলো ১. ঋণ লেনদেনের বিবাদ। ২. গচ্ছিত রাখা বস্তু ফেরত না দেওয়া। ৩. অন্যের বস্তু অন্যের কাছে বিক্রি করা। ৪. দলবদ্ধ হয়ে কারো ওপর অত্যাচার করা। ৫. দান করা বস্তু ফেরত না দেওয়া। ৬.  বেতন কম দেওয়া বা না দেওয়া। ৭. প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করা। ৮. কেনা-বেচায় বিবাদ। ৯. পশুর মালিক ও পালনকারীর বিবাদ। ১০. সীমানা বিবাদ। ১১. কঠোর দণ্ড প্রদান। ১২. কটুবাক্য প্রয়োগ। ১৩. চুরি ও ডাকাতি। ১৪. বলাৎকার বা বলপ্রয়োগে কোনো কাজ করা। ১৫. ব্যভিচার। ১৬. স্ত্রী-পুরুষের ধর্মের বিচ্যুতি। ১৭. উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিবাদ। ১৮. জুয়া খেলা। [সত্যার্থ প্রকাশ, ষষ্ঠ সমুল্লাস]

স্বামী দয়ানন্দ জীর দূরদর্শিতার প্রতিফলন অন্য কোনো সমাজ সংস্কারকের মধ্যে সচরাচর দেখা যায় না, এটি বললে অত্যুক্তি হবে না। রাষ্ট্রহিত বা জাতীয়তাবাদের ভাবনা ভারতকে এমন এক সংস্কারক দিয়েছিল যাঁর আদর্শ জানার পর প্রতিটি ব্যক্তি তাঁর অনুরাগী হয়ে ওঠেন। এটিও এক ধ্রুব সত্য যে "Dayanand was first to proclaim India for Indians" অর্থাৎ ভারতের ওপর ভারতবাসীদের স্বত্ব থাকুক, এই ঘোষণা সর্বপ্রথম স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীই করেছিলেন।

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.