আচার্য প্রিয়দর্শন সিদ্ধান্তভূষণ ~ জীবনচরিত ও অবদান

 

আচার্য প্রিয়দর্শন সিদ্ধান্তভূষণ ~ জীবনচরিত ও অবদান

আচার্য প্রিয়দর্শন সিদ্ধান্তভূষণের জন্ম ১৯১০ খৃস্টাব্দের ১৫ই মে, বঙ্গাব্দ ১৩১৭ সন, ১লা জ্যৈষ্ঠ। শতবর্ষ পার হয়েও সেই দীর্ঘদেহ, মুণ্ডিত মস্তক, ভাবগম্ভীর মুখাবয়বের অধিকারী, সাধাসিধে অথচ উচ্চ জীবনাদর্শে অভিষিক্ত মানুষটির ঋজু মূর্তি আজও অনেকের মনে শ্রদ্ধার আসন অধিকার করে আছে। তাঁর কথা বিনম্র ভাষণে বলেন, এমন মানুষের সংখ্যা নেহাত অল্প নয়। তবু একথা স্বীকার করতেই হয় যে, এই পণ্ডিতের নাম যতটা উজ্জ্বল অক্ষরে ইতিহাসে লিখিত হবার দাবী রাখে, ততটা অবশ্যই হয়নি। কেন তাঁকে ক্ষণজন্মা বলব, সে প্রশ্নের উত্তরের প্রধান সূত্রটি এইখান থেকেই পাওয়া যেতে পারে। ভারতের চিরন্তন আদর্শ হল কর্মের মধ্যে নিজের অস্তিত্বরক্ষা, নামের মধ্যে নয়। তাই তো বহু মনীষীর নাম হারিয়ে গেছে, কিন্তু তাঁদের কর্মের রেখাটি চিরস্থায়ীভাবে অঙ্কিত হয়ে রয়েছে। নিজ সত্তাকে কর্মের মধ্যে বিলীন করে নিজেকে গোপন রাখা-সে বড় সহজ নয়। সহজ নয় অনেক ঝড়জলের মধ্যেও উঁচু মাথা তেমনই উঁচু রাখা। পরাধীন ভারত থেকে স্বাধীন ভারতে নিয়ত পরিবর্তিত হতে থাকা সময়-তার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তিমানস ও সমষ্টিমানসে আপন পদ্ধতিতে আধ্যাত্মিক তথা মানবকল্যাণের বৃক্ষরোপণ করাও সহজ নয়। এতগুলো অসহজ পথে হেঁটে চলে এসেছেন যে ব্যক্তি, তাঁকে তাঁর সাফল্য-অসাফল্যের নিরিখে নয়, মাপতে হবে চিরকালীন অদমনীয় কষ্টিপাথরে। সেখান থেকেই শুরু তাঁর জীবনের গল্প বলা।

সময়টা ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগে। বর্ধমান শহর পেরিয়ে ধানবাদের দিকে যেতে ছোটছোট কোলিয়ারি অঞ্চল কুলটী। সেখানকার অধিবাসী নবকুমারের ছয় সন্তানের মধ্যে কনিষ্ঠ প্রিয়দর্শন। বাল্যে পিতার মৃত্যুর পর মা গৌরীদেবীর সান্নিধ্যে বড় হয়ে ওঠেন তিনি। পরিবারটি বিশ্বাস ও আচার-বিচারে বৈষ্ণব, কিন্তু মালা-কণ্ঠীর প্রচলন ছিল না। ছিল দেবতার প্রতি নিষ্ঠা। পুরাণসমূহের পাঠাদি নিত্যকর্মের মধ্যে পড়ত। এই নিষ্ঠাই আমরা পরবর্তীকালে প্রিয়দর্শনের কর্মের মধ্যে আকারিত হতে দেখি, যদিও ততদিনে তা গতি বদল করে দয়ানন্দ সরস্বতীর আদর্শে পরিপুষ্ট হয়েছে।

আধুনিক ভারতে প্রাচীন বৈদিক সভ্যতার প্রকৃত মূল্যায়নের পথিকৃৎদের মধ্যে দয়ানন্দ সরস্বতীর নাম জ্যোতিষ্কসম উজ্জ্বল। তাঁর সেই আদর্শে প্রিয়দর্শন দীক্ষিত হন দেশের কাজ করতে করতেই। কুলটী হাই স্কুলে তাঁর প্রথম প্রথাগত শিক্ষার আরম্ভ। তারই সঙ্গে সঙ্গে পরাধীন ভারতবর্ষের তৎকালীন অবস্থার সাথে পরিচয়ের শুরু। জীবনের সেই চলার শুরুতে দেশকে চেনার জানার মন তৈরি হয়েছিল স্বামী বিবেকানন্দের রচনাপাঠের মাধ্যমে। ভারতের চিরন্তন আত্মিক রূপটি ভারত বিবেকের চক্ষু দিয়ে দেখেছিলেন প্রিয়দর্শন।

ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে তাঁর সোচ্চার হয়ে ওঠার শুরু সেই ছাত্রাবস্থাতেই। স্কুলে স্কাউটের লিডার ছিলেন প্রিয়দর্শন। একদিন রাষ্ট্রগান হিসেবে 'গড সেভ দ্য কুইন' গাইতে অস্বীকার করেন, এমনকী নিজের দলের কাউকে সে গান গাইতেও দেন নি। হেডমাস্টারমশাইয়ের আদেশ অগ্রাহ্য করার ফল বলাই বাহুল্য ভালো হয় নি। বাড়ি ফিরে স্কাউটের পোষাক ছুঁড়ে ফেলে দেন, স্কাউটের দলও ছেড়ে দেন। সেই দিন থেকে খাদি পরার ব্রত গ্রহণ, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই ব্রতে অটুট ছিলেন তিনি।

সমসাময়িক রাজনীতির প্রতি তাঁর ক্রমবর্ধমান আকর্ষণকে সুদৃষ্টিতে দেখেননি পরিবার, কিন্তু পরাধীনতার ক্লেদমুক্তির সংগ্রাম থেকে কোনো বাধাই প্রিয়দর্শনকে দূরে রাখতে পারে নি। সে সময়ে কুলটী অঞ্চলে শ্রমিকদের সংগঠিত করার কাজ চলছিল। ১৯২১ এ সে কাজে সেখানে আসেন স্বামী বিশ্বানন্দজী। আশেপাশের কোলিয়ারিগুলি মিলিয়ে সেসব জায়গায় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের মতো ব্যক্তিত্বরাও বক্তৃতা দিতে আসতেন। তারই মধ্যে ধীরে ধীরে কিশোর প্রিয়দর্শনের দেশের জন্য কাজ করার ইচ্ছে সঙ্কল্পের আকার নিতে শুরু করে।

বেদ সকল সত্যবিদ্যার আকর-এই আদর্শকে সামনে রেখে ঊনবিংশ শতকে দয়ানন্দ সরস্বতীর যে ধর্ম আন্দোলন শুরু হয়, তারই সাংগঠনিক রূপ ১৮৭৫-এ বোম্বেতে আর্যসমাজ প্রতিষ্ঠা। এর পর দেশ জুড়ে বিভিন্ন স্থানে আর্যসমাজের শাখা প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। এই সকল শাখাকে অবলম্বন করে নতুন আঙ্গিকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গীতে বেদ প্রচারের সাথে সাথে সমাজ কল্যাণের বিভিন্ন কাজকর্মও বাস্তবায়িত হয়। বঙ্গভূমিতে আর্যসমাজের প্রকাশকাল আরো দশ বছর পর, অর্থাৎ ১৮৮৫, স্থান কলকাতা। তারও বহুবছর পর কুলটীর নিকটবর্তী আসানসোলে আর্যসমাজ মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়।

সনাতন পৌত্তলিকাতাকে অস্বীকার করে নিরাকার এক ঈশ্বরের সাধনা, সমাজের অযৌক্তিক বিধিবিধানের বিরোধিতা করা ইত্যাদি প্রচার ও প্রসারের জন্য তখন নিয়মিতভাবে আর্যসমাজের পক্ষ থেকে ছোট ছোট পুস্তিকা প্রকাশ করা হত। তেমনই কিছু পুস্তিকার মাধ্যমে আর্য্যসমাজের মতাদর্শের সাথে প্রথম পরিচয় প্রিয়দর্শনের। সেইসময় আসানসোল আর্যসমাজকে কেন্দ্র করে কুলটীতে আর্যসমাজের প্রচারকার্য বিশিষ্ট রূপ নেয়, যদিও অনেক সময়েই অনাথালয়ের জন্য অর্থসংগ্রহের মতো সমাজিক উন্নতিবিধানই সেখানে লক্ষ্য ছিল। বাড়িতে সম্মতি না থাকায় প্রিয়দর্শন গোপনে তাঁদের সেইসকল প্রচারকার্যের অংশ নিতে থাকেন। ঘটনা পরম্পরায় তাঁর পরিচয় হয় পণ্ডিত দীনবন্ধু বেদশাস্ত্রীর সাথে। পরবর্তীকালে সমাজসেবা, ধর্মপ্রচার ও সাহিত্যিক কাজকর্মের পরিসরে এই সুবক্তা, শাস্ত্রজ্ঞ, রাজনৈতিকবোধযুক্ত ব্যক্তির সাথে প্রিয়দর্শনের যে চিরন্তন প্রন্থিবন্ধন দেখা গিয়েছিল তার সূত্রপাত এইখানেই।

প্রিয়দর্শনের জীবনে এইসময় আরেক ব্যক্তির প্রভাব পড়ে। তিনি পণ্ডিত শঙ্করনাথ। বাংলার তদবধি প্রতিষ্ঠিত আর্যসমাজের প্রধান স্তম্ভরূপে পরিচিত শঙ্করনাথ। বেতিয়া, চম্পারণ প্রভৃতি স্থানে প্রচারকার্যে ব্যস্ত শঙ্করনাথ প্রিয়দর্শনকে চিঠি লিখে সেইসকল স্থানের অবস্থা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল করাতেন।

এইসময়ের একটি ঘটনা তাঁর দেশপ্রেমের রাজনৈতিক আদর্শ ও আধ্যাত্মিক তথা নৈতিক মূল্যবোধের সূত্রটিকে অঙ্গাঙ্গীভাবে গ্রথিত করে। জাতীয় কংগ্রেসের ৩৬ তম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় কলকাতার পার্ক সার্কাস ময়দানে। পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু, সুভাষচন্দ্র বোসের মতো ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিতে আপ্লুত হন যুবা প্রিয়দর্শন। সেকথা তাঁর লেখনীতেও স্থান পেয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে আধ্যাত্মচেতনার জাগরণের জন্য আর্যসমাজের পক্ষ থেকে প্রায় সকল জনসমাবেশে প্রচারকার্যের ব্যবস্থা হত। তেমনই ব্যবস্থা হয়েছিল পার্কসার্কাস ময়দানেও। আর্যসমাজের সেই স্টলটিতে নিত্য যাতায়াত ছিল প্রিয়দর্শনের। তাছাড়া সেসময় কলকাতায় থাকার জন্য ব্যবস্থাও হয় কলকাতা আর্যসমাজে, সঙ্গী ছিলেন দীনবন্ধু বেদশাস্ত্রী। এমন করে ধীরে ধীরে আর্যসমাজের সাথে তাঁর বন্ধন দৃঢ় হতে থাকে।

দয়ানন্দ সরস্বতীর মতাদর্শে সম্পূর্ণভাবে নিজেক গড়ে তোলার কাজে প্রিয়দর্শনের পরবর্তী উল্লেখনীয় পদক্ষেপ ছিল তাঁর লাহোর যাওয়া। ১৯৩৪ সালের জুন মাস নাগাদ তিনি বিখ্যাত লাহোর উপদেশক বিদ্যালয়ে পঠন পাঠনের জন্য যান। সেখানে স্বামী স্বতন্ত্রানন্দ, স্বামী বেদানন্দের মতো বিদ্বান পণ্ডিত আচার্যগণের কাছে বেদাদি গ্রন্থ ও অন্যান্য সংস্কৃত শাস্ত্র অধ্যায়ন করে 'সিদ্ধান্তভূষণ' উপাধির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এর পর বাংলায় ফিরে এসে আর্যসমাজের একজন অন্যতম উপদেশক আচার্য হিসেবে তিনি পরিচিত হন। আমৃত্যু, এমনকী তাঁর মৃত্যুর পরেও তাঁর সেই পরিচয় একই উজ্জ্বলতায় অমলিন রয়েছে।

যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অকুতোভয় প্রিয়দর্শন পরাধীন জন্মাভূমির স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন, তার জন্য কারাবরণও করেছেন একাধিকবার। লাহোর যাবার বছর ছয়েক পূর্বে, অর্থাৎ ১৯২৮-এ তিনি সুভাষচন্দ্র বোস দ্বারা পরিচালিত বন্দবিলা সত্যাগ্রহে অংশ নেন। শ্রী বিপিন বিহারী গাঙ্গুলীর সাথে সে বিষয়ে তাঁর নিয়মিত পত্রালাপ শুরু হয়। সত্যাগ্রহে অংশ নেবার জন্য কুলটা থেকে অতি গোপনে তিনি কলকাতায় এসে পৌঁছান, তারপর বন্দবিলা যাত্রা করেন। ব্রিটিশ সরকারের গুপ্তচর পুলিশের নজর এড়াবার জন্য বন্দবিলা গ্রামে পৌঁছে ছদ্মবেশ নেন, নিজের নাম বদলে রাখেন নবীন সিং। কিন্তু শেষরক্ষা হয় নি, তিনি ধরা পড়েন এবং তাঁর ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড হয়। ছয় মাস বাদে আবার মুর্শিদাবাদ জেলে তাঁকে বন্দী করে রাখা হয়। সেখানে ১৩ দিন লাগাতার অনশন করেন তিনি। অবশেষে স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীকালে জাতীয় কংগ্রেস ও তার আন্দোলনের স্বরূপ নিয়ে প্রিয়দর্শনের মনে দ্বিধা তৈরি হয়েছিল, ফলে অনেকাংশে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ থেকে তিনি সরে আসেন। কিন্তু আন্দোলনের জন্য অর্থসংগ্রহ করে পাঠানো ইত্যাদি থেকে পিছপা হননি কোনোদিন।

কেবলমাত্র রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক রেখাবন্ধন দিয়ে দেশ তৈরি হয় না, তার মুখ্য উপাদান দেশের মানুষ-একথা প্রিয়দর্শন কখনো বিস্তৃত হন নি। আর্যসমাজের সাথে যুক্ত হয়ে বন্যা, ভূমিকম্প ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিজ জীবন বিপন্ন করে ত্রাণদল নিয়ে গেছেন ত্রিপুরা, বরিশাল, নোয়াখালি, ফরিদপুর, মেদিনীপুর।

প্রিয়দর্শনের বহুমাত্রিক কর্মজীবনের শুরু কলকাতা থেকে, আর্যসমাজের উপদেশকরূপে। পরে বর্তমান বাংলাদেশের অন্তর্গত রাজশাহীতে তিনি প্রচারকার্য শুরু করেন। ১৯৪২-এ রাজশাহী কলেজে তিনি অধ্যাপকরূপে নিযুক্ত হন। এই সময়েই সিলেট আর্যসমাজের মন্ত্রী শ্রী কামিনী মোহনের কন্যা শ্রীমতী অমলা দেবীর সাথে তাঁর বিবাহ হয়। কেবলমাত্র একজন ভার্যারূপেই নন, যথার্থ ধর্মপত্নীরূপে প্রিয়দর্শনের সকল কর্মযজ্ঞে তিনি অনুপ্রেরণাদাত্রী ছিলেন। কন্যা মানসী ও পুত্র নচিকেতার জন্মের পর দেশভাগের সময় স্থায়ীভাবে কলকাতায় ফিরে আসেন প্রিয়দর্শন, কলকাতা আর্যসমাজের পুরোহিত-বিদ্বান রূপে আরেকবার তাঁর অভিষেক হয়। আর্যসমাজ কলকাতার বালক-সৎসঙ্গ ও মহিলা সমাজের আচার্য হিসেবে দায়িত্বভার পান তিনি, আজীবন সেই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

তাঁর বৈচিত্রপূর্ণ কর্মজীবনে উল্লেখযোগ্য আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের হিন্দি শিক্ষার আসরে শিক্ষকের ভূমিকায় প্রায় পাঁচ বছর যুক্ত থাকা। রাজশাহীতে থাকার সময় রাজশাহী জেলের নীতিশিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন, পরে স্বাধীন ভারতে হাওড়া কারাগারে কয়েদীদের নীতিশিক্ষার শিক্ষক হিসেবেও কাজ করেছেন দীর্ঘকাল।

অসীম পাণ্ডিত্যের অধিকারী এই মানুষটির বাগ্মীতায় আকৃষ্ট হতেন না এমন মানুষ সেসময়ে দুর্লভ ছিল, সেই আকর্ষণেই কলকাতার গন্ডী ছাড়িয়ে গ্রামবাংলার মানুষও তাঁর সান্নিধ্যলাভের জন্য উৎসুক হয়ে উঠেছিল। ফলস্বরূপ, তাঁর প্রেরণায় হুগলী জেলার বেলেডাঙায় আর্যসমাজের একটি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়, আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও শারীরিক উন্নতির জন্য প্রতিষ্ঠা হয় যজ্ঞশালা ও ঔষধালয়।

প্রিয়দর্শনের নেতৃত্বে গ্রামবাংলায় দয়ানন্দের আদর্শ পূর্ণ সংগঠনিক রূপ পায় বর্তমান উত্তর ২৪ পরগণার অন্তর্গত চণ্ডীপুর গ্রামে। ওই গ্রামের অধ্যাত্মচেতনায় উদ্বুদ্ধ কিছু ব্যক্তির ঐকান্তিক ইচ্ছায় ও সহযোগিতায় ১৯৭৮-এ প্রতিষ্ঠিত হয় চণ্ডীপুর আর্যসমাজ। যজ্ঞশালা ছাড়াও স্থাপিত হয়েছিল নিঃশুল্ক চিকিৎসাকেন্দ্র, অতিথিশালা ও বেদ পঠন পাঠনের জন্য বেদ বিদ্যালয়। পরবর্তীকালে এই সংস্থাটিকে কেন্দ্র করে আশেপাশের গ্রামের সেবামূলক বিভিন্ন প্রকল্প চালু হয়। ৪৩ বছর অতিক্রম করেও চণ্ডীপুর আর্যসমাজ আজও বৈদিক আদর্শ অনুসরণকারী জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বমহিমায় ভাস্বর।

দয়ানন্দের আদর্শ ও বেদ প্রচারের কাজে প্রিয়দর্শন বিদেশযাত্রা করেছেন একাধিকবার, অংশগ্রহণ করেছেন নাইরোবি (১৯৭৮) ও লণ্ডন (১৯৮০)-এ অনুষ্ঠিত আন্তঃরাষ্ট্রীয় আর্য মহাসম্মেলনে।

গভীর জীবনবোধের অধিকারী হবার পূর্ববর্তী শর্ত হল উদার দৃষ্টিভঙ্গীর অধিকারী হওয়া। একই সাথে নিজ মত প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যমতের পুঙ্খানুপুঙ্খ জ্ঞান অর্জনেরও প্রয়োজন। এরকম কিছু গুণের অপূর্ব সমন্বয় সাধিত হয়েছিল প্রিয়দর্শনের মধ্যে। তাই বেদ-বেদান্ত অধ্যয়নের সাথে সাথে প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির অন্যান্য ধারা, যেমন পৌরাণিক সাহিত্য, রামায়ণ-মহাভারত, ব্রাহ্মসমাজের সাহিত্য ইত্যাদি সম্বন্ধে তাঁর কৌতূহল ও জ্ঞানের পরিধি বহুদুর বিস্তৃত ছিল। সমসাময়িক সাহিত্যিকদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের উপনিষদচর্চা তাঁর নিজস্ব চিন্তাভাবনা গঠনে প্রভূত উপাদান জুগিয়েছিল। কবিগুরুর 'শান্তিনিকেতন' প্রবন্ধমালার নাম এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য।

"ক্ষণজন্মা লোক যাঁরা তাঁরা শুধু বর্তমান কালের নন। বর্তমানের ভূমিকার মধ্যে ধরতে গেলে তাঁদের অনেকখানি ছোট করে আনতে হয়...মহাকালের পটে যে ছবি ধরা পড়ে, বিধাতা তার থেকে প্রাত্যহিক জীবনের আত্মবিরোধ ও আত্মখণ্ডনের অনিবার্য কুটিল ও বিচ্ছিন্ন রেখাগুলি মুছে দেন, যা আকস্মিক ও ক্ষণকালীন তাকে বিলীন করেন; আমাদের প্রণম্য যাঁরা তাঁদের একটি সংহত সম্পূর্ণ মূর্তি সংসারে চিরন্তন হয়ে থাকে।"

শান্তিনিকেতন - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সুচারু গদ্যলিখনের অপূর্ব ক্ষমতার উৎকৃষ্ট ফসল তাঁর সাহিত্যকর্মগুলি। সাহিত্যিক জীবনের শুরুর দিকে 'আর্যরত্ন' ও পরে 'আর্যপত্র' নামক দুটি পত্রিকার সঞ্চালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তিনি। ১৫ বছরেরও বেশী সময় ধরে বেদমাতা নামক মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন। আর্থিক সঙ্গতি বিশেষ কিছু না থাকলেও প্রতিষ্ঠা করেন 'বৈদিক সাহিত্য পীঠ' নামক প্রকাশনী। 'যথার্থতা', কৃষ্ণের আহ্বান', 'মানব ধর্মের স্বরূপ', 'পুরীর জগন্নাথ' (কবিতা), 'দেবযজ্ঞ', 'সাকারবাদ', 'কালীরঞ্জন', 'আমরা আর্য' প্রভৃতি তাঁর রচিত মৌলিক গ্রন্থ। তাঁর অনুবাদকার্যের মধ্যে পড়ে 'আর্যাভিবিনয়', 'বৈদিকধর্মধারা', 'মেরী যাত্রা', 'পুনাপ্রবচন' প্রভৃতি গ্রন্থের বাংলা ভাষান্তর। আর্যসমাজের শতবৎসর উদ্যাপন উপলক্ষ্যে যে ইতিহাস সংগৃহীত ও লিখিত হয়, তাঁর বাংলা অনুবাদ করেন প্রিয়দর্শন, বইটির নাম 'আর্য্যসমাজ কলিকাতা শতাব্দীর ইতিহাস'। দয়ানন্দ সরস্বতীর বিখ্যাত গ্রন্থ সত্যার্থ প্রকাশের বাংলা অনুবাদের ষষ্ঠ সংস্করণের সম্পাদনার কাজ করেন, গ্রন্থটির বাংলা অনুবাদের কাজেও তিনি যুক্ত ছিলেন। তবে তাঁর যুগান্তকারী কাজ যজুর্বেদের দয়ানন্দকৃত ভাষ্যের বাংলা অনুবাদ। আকারে অতি বৃহৎ এই ভাষ্যনুবাদটি তাঁর জীবনের শেষ প্রায় দশ বছরের পরিশ্রমের ফসল।

১৯৮৩ তে আজমীরে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে বৈদিক সাহিত্য কার্য ও সমাজসেবার জন্য সমারোহ সমিতির পক্ষ থেকে তাঁকে 'আচার্য' উপাধিতে ভূষিত করে প্রশস্তিপত্র দেওয়া হয়।

কর্মের প্রতি নিষ্ঠাবান, বলিষ্ঠ স্বাস্থ্যের অধিকারী এই ব্যক্তিকেও কালের অপ্রতিরোধ্য গতি একসময় বশ করল। ১৯৯০-এর আর্যসমাজ কলকাতার বার্ষিক অনুষ্ঠানে তিনি অংশগ্রহণও করতে পারেন নি। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীরা সাক্ষী আছেন, বার্ষিকোৎসবের শোভাযাত্রাটি তাঁর বিবেকানন্দ রোডের বাড়ির সামনে আসতে তিনি সকল অসুস্থতাকে অতিক্রম করে জানলা দিয়ে 'ওম' লেখা একটি পতাকা উৎসাহের সাথে আন্দোলিত করতে থাকেন। যে প্রতিষ্ঠানের সাথে তাঁর জীবনের প্রতিটি গ্রন্থি অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে বাঁধা পড়েছিল, সেদিন তার পতাকা বইবার দায়িত্ব তুলে দিয়ে যান উত্তরসুরীদের হাতে। ১৯৯১-এর ১৬ই জানুয়ারী ব্রাহ্মমুহূর্তে তাঁর মর্তজীবনের অবসান হয়।

১৯৯১ থেকে ২০২১-দীর্ঘ তিনটি দশক অতিক্রান্ত। বর্তমান নাগরিক সভ্যতার তথাকথিত সাফল্যের মাপকাঠিতে প্রিয়দর্শনের জীবন হয়ত তেমন কিছু দাগ রেখে যায় না, তবু যে পথে তিনি হেঁটেছেন, তাতে সাফল্য নয়, একটি ঋজু সত্যনির্ভর জীবনের আদর্শ পাথেয় হয়, যা চিরস্মরণীয়, চির আদরণীয়। 'বিলাস' তাঁর জীবনের একটি অপরিচিত, সম্ভবত সবচেয়ে অপছন্দের শব্দ ছিল। অর্থের সম্ভার, দামী চাকরি, এমনকী নিজের বাড়ি- কিছুই তাঁর ছিল না, অথচ সেসবের অভাববোধও তিনি করেন নি কোনোদিন। বিবেকানন্দ রোডের দুকামরার ছোট্ট ভাড়ার ঘরে আয়োজন ছিল অতি স্বল্প। কিন্তু যেমন প্রকৃত সাধনার আসন নিজ অন্তরেই পাততে হয়, তেমনই অতি সামান্য আয়োজনের মধ্যেই তিনি নিজ কর্মযজ্ঞের পূজার আসনটি পেতে ছিলেন। তাঁর সে পূজার উপচার বলতে যা ছিল সবই তাঁর অন্তরের অন্তরতর। অমন তেজোদীপ্ত চক্ষুর উজ্জ্বল আভায় জ্ঞানের গরিমা আপনিই প্রকাশ পেত, মেরুদণ্ড সিধে করে চলার ছন্দে বিনা আয়াসে দেখা যেত তাঁর চরিত্রের দৃঢ়তা, কিন্তু নিজেকে জাহির করার প্রয়োজন তিনি কখনো অনুভব করেন নি, বস্তুত ঠিক বিপরীতটাই তাঁর পক্ষে স্বাভাবিক ছিল। মৌলিক লেখালিখি, অনুবাদ ইত্যাদির সাথে সাথে ছবিও আঁকতে পারতেন প্রিয়দর্শন। নিজের অনেক বই-এর প্রচ্ছদও করেছেন তিনি স্বয়ং। কিন্তু সেকথা জনসমক্ষে বলা তো দূরের কথা, কখনো ছাপার অক্ষরে শিল্পী আলংকারিক হিসেবে তাঁর নামও উল্লিখিত হয় নি। অনুবাদের ক্ষেত্রে নিজের নাম বই-এর কভারে লেখার পক্ষপাতী ছিলেন না। সবচেয়ে বড়ো কথা, আদর্শ তাঁর কাছে অমূর্ত অধরা কিছু ভাবনা হয়েই থেকে যায় নি, যে আদর্শে তিনি বিশ্বাস করতেন, তাকে নিজ জীবন দিয়ে হাতেকলমে পালন করেছেন। পরাধীন ভারতে স্বদেশী আন্দোলনের যে দিগ্‌দর্শন প্রচার পেয়েছিল, স্বাধীন পরবর্তী ভারতেও তাকে অন্তরে ধারণ করে নিজের হাতে চরকায় সুতো কেটেছেন প্রিয়দর্শন, সেই সুতোর তৈরি জামা পরেছেন। অন্যদিকে, তাঁর কাছে দয়ানন্দের মতাদর্শ মেনে চলার অর্থ কেবলমাত্র গতানুগতিক প্রবাহে গা ভাসানো ছিল না, তা ছিল বাংলার মাটিতে বঙ্গ-সংস্কৃতিকে আপন করে সেই মত জনগণের মধ্যে সহজ ভাবে সঞ্চারিত করার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা। তাঁর বেদমন্ত্র পাঠের পদ্ধতি, অর্থগৌরব-সমৃদ্ধ ভাষায় প্রবচন ও বৈদিক কর্মকাণ্ডের ত্রুটিহীন পৌরহিত্য সেই প্রচেষ্টার অঙ্গীভূত।

মর্তজীবনের কিছু পূর্বনির্ধারিত শর্ত থাকে, অনিচ্ছাকৃত চলাচল, অপ্রতিরোধ্য খারাপ লাগা, দৈনন্দিন জীবনের ওঠাপড়া। একজন মানুষ হিসেবে সেসবের ঊর্ধ্বে ছিলেন না আচার্য প্রিয়দর্শন সিদ্ধান্তভূষণ। কিন্তু মহাকালের স্পর্শে সেসব ক্ষুদ্র দাগ মুছে গেছে, যা চিরভাস্বর হয়ে থেকে গেছে তা তাঁর একজন সাদামাটা মানুষ থেকে একটি প্রতিষ্ঠানের মতো বৃহৎ হয়ে ওঠার কাহিনি। আজ বহুদূর থেকে দেখলে মহীরুহের মতো লাগে তাঁকে।

মহীরুহ হতে পারা সহজ নয়, রৌদ্র-ঝড়-জল সহ্য করে আকাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকতে যে প্রাণশক্তি লাগে, তার অফুরান আধার ছিলেন প্রিয়দর্শন। জীবনের চরম দুঃখের দিনেও তেমনই অবিচলিত থেকেছেন। মহীরুহের মতোই বহু মানুষ তাঁর অবাক করা ব্যক্তিত্বের আশ্রয়ে জীবনের গোলোকধাঁধায় নিজের সঠিক মার্গ খুঁজে পেয়েছে, শান্ত হয়েছে, ঋদ্ধ হয়েছে। সেই আচার্যকে আমার অন্তরের শতকোটি প্রণাম।


সূত্র: যজুর্বেদভাষ্যম্‌ - ১ম খণ্ডের ভূমিকা

গার্গী ভট্টাচার্য

অধ্যাপক

সংস্কৃত, পালি ও প্রাকৃত বিভাগ

বিশ্বভারতী, শান্তিনিকেতন।

০১/১১/২০২১

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.