মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীর বেদ-বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি

 

✅মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীর বেদ-বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি
 
⚠️আর্যসমাজের সংস্থাপক মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী (১৮২৪ খ্রি.–১৮৮৩ খ্রি.) আধুনিক যুগে বেদসমূহ সম্পর্কে বহু মৌলিক বিষয়ে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। যথা: 
 
১. ঋক্‌, যজুঃ, সাম ও অথর্ব এই চারটি মন্ত্রসংহিতাই ‘বেদ’। এই চার মন্ত্রসংহিতাই ঈশ্বরপ্রণীত তথা অপৌরুষেয় জ্ঞানগ্রন্থ। এই চারটির বাইরে যত গ্রন্থ আছে মান্য হোক বা অমান্য সবই মানবকর্তৃক রচিত, অর্থাৎ পৌরুষেয়।
২. বেদে জ্ঞান, বিজ্ঞান, কর্ম ও উপাসনা এই চার বিষয়ে, তথা ঈশ্বর, জীব ও প্রকৃতি (এবং প্রকৃতি থেকে উৎপন্ন সৃষ্টিজগৎ) সম্পর্কে নির্ভ্রান্ত জ্ঞান বর্ণিত হয়েছে। বেদজ্ঞানের সহায়তায় ধর্মানুকূল জাগতিক আচার-ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষ তার জীবনের পরম লক্ষ্য পরমাত্মাকে লাভ তথা মোক্ষ লাভ করতে সক্ষম হয়।
৩. বেদে কোনো রাজা, প্রজা, দেশ, ব্যক্তি ইত্যাদির ইতিহাস আদৌ নেই। বেদ তো সৃষ্টির আদিতে প্রকাশিত হয়েছে; বেদ নিত্য অর্থাৎ সর্বকল্পে একরূপ, তাতে কোনো নির্দিষ্ট মানুবীয় ইতিহাস নেই। বেদপ্রকাশের পর মানুষের প্রয়োজন অনুসারে ব্যক্তি, দেশ, পর্বত, নদী, সমুদ্র প্রভৃতির নাম বেদের শব্দের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়েছে। এই নামকরণের প্রথা আজও প্রচলিত। কিন্তু এর দ্বারা এই ধারণা করা যে, বেদে ঐ নামধারী ব্যক্তিদের ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে এটি সম্পূর্ণ অনুচিত। বেদে মানবজাতির অনিত্য ইতিহাসের সর্বাংশে অভাব রয়েছে। হ্যাঁ, সৃষ্টির নির্মাণ কীভাবে হয়, প্রথমে কী সৃষ্টি হয়, পরে কী সৃষ্টি হয়, এই চক্র কীভাবে চলে, কোন নিয়মে সৃষ্টিজগৎ পরিচালিত হয় এই সকল প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক সমাধানরূপে সৃষ্টির নিত্য ইতিহাস বেদে বিদ্যমান; কিন্তু কোনো প্রকার অনিত্য মানবীয় ইতিহাস সেখানে নেই। সমগ্র বৈদিক সাহিত্য এই সত্যকে প্রমাণ করে যে, বেদে কোনো দেশ, সমাজ বা ব্যক্তির ইতিহাস নেই। অতএব যারা বেদে মানবীয় ইতিহাসের সূত্র বা ইঙ্গিত অনুসন্ধানে বিশ্বাসী এবং সেই উদ্দেশ্যে কাজ করছেন, তারা প্রকৃতপক্ষে বেদের বাস্তব স্বরূপ অনুধাবনে গুরুতর ভ্রান্তি করছেন।
৪. বেদে তিনটি সত্তাকে অনাদি, অনুৎপন্ন ও নিত্যরূপে স্বীকার করা হয়েছে ঈশ্বর, জীব ও প্রকৃতি। এই তিন সত্তার অস্তিত্ব সর্বদাই বিদ্যমান থাকে; অতএব কখনোই এদের অভাব ঘটে না। এরা তিনজনই অনাদি কখনো উৎপন্ন হয় না; অনন্তকাল পূর্ব থেকে ছিল এবং অনন্তকাল ভবিষ্যতেও থাকবে। তদুপরি, এই তিন সত্তা কখনোই একে অপরের মধ্যে রূপান্তরিত হয় না। অর্থাৎ ঈশ্বর কখনো জীব বা প্রকৃতি হন না; জীব কখনো ঈশ্বর বা প্রকৃতি হয় না; এবং প্রকৃতি কখনো ঈশ্বর বা জীব হয় না। নিজ নিজ স্বাভাবিক গুণের ভিত্তিতে এরা চিরকাল পৃথকই থাকে, কখনো অভিন্ন বা এক হয়ে যায় না। ঈশ্বর ও জীব চেতন, কিন্তু প্রকৃতি জড়। জীবকল্যাণের জন্য, তাদের উন্নতি ও মোক্ষপ্রাপ্তির সুযোগ প্রদানের উদ্দেশ্যে ঈশ্বর প্রকৃতি থেকে সৃষ্টি নির্মাণ করেন। এই সৃষ্টি আজ পর্যন্ত অসংখ্যবার সৃষ্টি ও প্রলয়প্রাপ্ত হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও অসংখ্যবার এই চক্র চলতে থাকবে। সৃষ্টি–প্রলয়ের এই ক্রমও অনন্ত।
৫. মানুষের চূড়ান্ত বিকাশ ও উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় সমগ্র জ্ঞান বেদে বর্ণিত হয়েছে। সমস্ত প্রকার জ্ঞান-বিজ্ঞান বেদে নিহিত। ঈশ্বরপ্রাপ্তি বা মোক্ষপ্রাপ্তিকেই বেদ মানবজীবনের পরম লক্ষ্য বলে ঘোষণা করে। বেদের প্রধান বিষয় আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান। বেদে ভৌতিক জীবনের প্রতি অবজ্ঞা নেই; তার উৎকর্ষের উপাদানও সেখানে বিদ্যমান, তবে আধ্যাত্মিক ঐশ্বর্যের তুলনায় ভৌতিক ঐশ্বর্যকে গৌণ বলা হয়েছে।
৬. বেদ জগৎকে বাস্তব ও উদ্দেশ্যপূর্ণ বলে মানে। জগৎকে স্বপ্নবৎ মিথ্যা বলে দেহগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উন্নতির জন্য কোনো আকাঙ্ক্ষা বা প্রচেষ্টা না করার যে নিরাশাবাদী চিন্তা বেদে তার সম্পূর্ণ অভাব রয়েছে। বেদ আমাদের জ্ঞান–কর্ম–উপাসনাময় কর্মঠ জীবনের শিক্ষা দেয়।
৭. বেদে বিশুদ্ধ একেশ্বরবাদের প্রতিপাদন করা হয়েছে। একমাত্র সচ্চিদানন্দস্বরূপ, সর্বব্যাপক, নিরাকার, অনন্ত, সর্বশক্তিমান চেতন ঈশ্বরের গুণ–কর্ম–স্বভাবের জ্ঞান দেওয়ার জন্য বেদে তাঁর বহু নাম দ্বারা স্তব ও যথার্থ বর্ণনা করা হয়েছে। অতএব ইন্দ্র, বরুণ, প্রজাপতি, সবিতা, বিধাতা, অগ্নি, গণপতি প্রভৃতি নাম দেখে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যে বেদে বহু ঈশ্বরের স্তব আছে এ এক গুরুতর ভ্রান্তি। বেদ এক ঈশ্বরেরই স্তব, প্রার্থনা ও উপাসনার শিক্ষা দেয়।
৮. বেদ মানবোপযোগী সমস্ত বিদ্যার মূল। ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই মানবজীবনের সকল অঙ্গ সম্পর্কে বেদ জ্ঞান প্রদান করে। ভৌতিক বিজ্ঞানের রহস্যও বেদে আছে, তবে সেগুলি বীজ বা সূত্ররূপে বর্ণিত; কোনো শাস্ত্ররূপে বিশদ ব্যাখ্যা নেই। কিন্তু এই সূত্রসমূহকে যথাযথভাবে বুঝে বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে বহু সত্য আবিষ্কার করা সম্ভব।
৯. বেদে যজ্ঞ, সংস্কার প্রভৃতি কর্মকাণ্ডেরও যথোচিত বর্ণনা রয়েছে। বেদার্থভিত্তিক, অর্থবহ ও বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ডকে সেখানে স্থান দেওয়া হয়েছে। ‘যজ্ঞ’ শব্দটি বেদে ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত যে সকল সদ্ভাবনাপ্রসূত কর্মের দ্বারা সুখ বৃদ্ধি ও দুঃখের উপশম হয়, সবই যজ্ঞের অন্তর্ভুক্ত। তবে বেদ কেবল দ্রব্যনির্ভর যজ্ঞ বা কর্মকাণ্ডেই সীমাবদ্ধ নয়; বেদ মূলত সত্যবিদ্যার গ্রন্থ। কর্মকাণ্ডও সেখানে মন্ত্রার্থনির্ভর হওয়া আবশ্যক।
১০. বেদ ও সৃষ্টি উভয়ই ঈশ্বরীয়। যেমন বেদ ঈশ্বরপ্রণীত জ্ঞানগ্রন্থ, তেমনি এই সৃষ্টিজগৎও ঈশ্বরকর্তৃক নির্মিত ও পরিচালিত। অতএব বেদ ও সৃষ্টির মধ্যে কোনো বিরোধ নেই; উভয়ের মধ্যে পূর্ণ সামঞ্জস্য ও সমন্বয় রয়েছে। বেদে সৃষ্টিসম্পর্কে যা বলা হয়েছে, সৃষ্টিজগতে আমরা তাই কার্যরত দেখি। এজন্য বেদ সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক।
১১. বেদে মানবসমাজকে ব্রাহ্মণ প্রভৃতি চার বর্ণে বিভক্ত করা হয়েছে, কিন্তু এই বিভাজনের ভিত্তি জন্ম নয় গুণ, কর্ম ও স্বভাব। জন্মভিত্তিক জাতিপ্রথা বেদবহির্ভূত ও বেদবিরুদ্ধ।
১২. বেদকে যথার্থভাবে বুঝতে ব্রাহ্মণগ্রন্থ, বেদাঙ্গ, উপাঙ্গ, উপবেদ, প্রধান মৌলিক উপনিষদ ও মনুস্মৃতি প্রভৃতি গ্রন্থ অধ্যয়ন অপরিহার্য। পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী, পতঞ্জলির মহাভাষ্য এবং যাস্কের নিরুক্ত ও নিঘণ্টু বেদের ভাষা ও অর্থ অনুধাবনে বিশেষ সহায়ক।
১৩. বেদের উপদেশ সর্বতোভাবে উদাত্ত, সার্বজনীন ও সকল প্রাণীর কল্যাণকর। বেদে সংকীর্ণতা বা সাম্প্রদায়িকতার কোনো স্থান নেই। বিশ্বমানবতার কল্যাণে বেদ বৈশ্বিক ধর্মের প্রতিনিধি।
১৪. বেদ ঈশ্বরীয় জ্ঞান; অতএব মানবমাত্রের উপর তার সমান মৌলিক অধিকার রয়েছে। কাউকে বেদাধিকার থেকে বঞ্চিত করার অধিকার কারও নেই।
১৫. আত্মার মধ্যে স্বাভাবিক জ্ঞান থাকলেও তা অল্প; প্রকৃত উন্নতি ঘটে অর্জিত জ্ঞানের দ্বারা। বেদ ঈশ্বরপ্রদত্ত নির্ভুল নৈমিত্তিক জ্ঞান এবং সেইজন্যই তা স্বতঃপ্রমাণ।
১৬. বেদের সকল শব্দ যোগিক বা যোগরূঢ়; রূঢ় বা যদৃচ্ছ নয়। তাই ধাতু–প্রত্যয়ের মাধ্যমে ব্যাকরণসম্মত অর্থ নির্ণয় আবশ্যক। মন্ত্রের আধিদৈবিক, আধিভৌতিক ও আধ্যাত্মিক তিন প্রকার অর্থ করা যায়।
১৭. আধুনিক কালে বহু পাশ্চাত্য পণ্ডিত বেদ নিয়ে কাজ করলেও, আর্ষ ঐতিহ্য ও ধর্মীয় পক্ষপাতের কারণে তারা বেদের প্রকৃত রূপ উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। মধ্যযুগীয় সায়ণ, মহীধর প্রমুখও কিছু ভ্রান্ত ধারণার কারণে যথার্থ ব্যাখ্যায় অসমর্থ হয়েছেন। 
১৮. বেদ সত্যে শ্রদ্ধা ও অসত্যে অশ্রদ্ধার শিক্ষা দেয়। বিদ্যার বৃদ্ধি ও অবিদ্যার বিনাশের আহ্বান জানায়।
 
🔰 স্বামী দয়ানন্দের বেদ-বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণভাবে জানতে তাঁর রচিত 'ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকা' অবশ্যই পাঠযোগ্য।
 
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.