মহর্ষি দয়ানন্দের নাস্তিকোদ্ধার
ভগবৎপাদ
মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী গুরু দক্ষিণায় গুরুর আদেশে নিজের সমগ্র জীবন যে
বৈদিক প্রচার ও বেদ পরম্পরার পুনরুদ্ধারের সমর্পণ করেন, সেই কর্মধারায়
অবৈদিক মত ও কুসংস্কার খণ্ডনও ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। মহর্ষি তার
জীবদ্দশায় বৈদিক সিদ্ধান্ত প্রচারকার্যের পাশাপাশি দীর্ঘকালীন প্রচলিত
অবৈদিক তথা বেদবিরুদ্ধ কথিত আস্তিক্যমতের খণ্ডন করেছে বহু অপরাজেয়
শাস্ত্রার্থ ও লেখনকার্যের মাধ্যমে।
ভারতবর্ষে
দীর্ঘকাল বেদবিরুদ্ধ মতের প্রচলনে সেই অবৈদিক মতের গর্ভেই জন্ম নেয়
বিভিন্ন নাস্তিক্যমত। অবৈদিকতার সহগামী কুসংস্কার ও অমানবিক কীর্তি যদিও
এসব নাস্তিক্যমতে উদ্ভবের কারণ হিসেবে বলা হয়, পরবর্তীতে প্রবল অবিদ্যার
প্রভাবে তাদের নিরীশ্বরবাদী মত জনমতে মিশে যেতে থাকে। কিন্তু যৌক্তিকতার
মিথ্যে দম্ভে মাথাচাড়া দেয়া এই নাস্তিকগণ মহর্ষির দয়ানন্দের নিকট কী করে
টিকতে পারতো!? মহর্ষির নিকট এমন বহু নাস্তিক তার মতের সিদ্ধি করতে আসে,
কিন্তু বেদমাতাকে হৃদয়ে ধারণ করা ভগবানের এই অনন্য শিষ্যের তার্কিক ও
শাস্ত্রীয় শব্দজ্যোতি তাদের নিরুত্তর করে দেয় এবং অনেকের ব্যক্তিত্ব বদলে
দেয় আজীবনের জন্য।
মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীর জীবনী থেকে এমন অনেক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়—
১) নাস্তিক ইঞ্জিনিয়ার থেকে আস্তিক বেদপাঠক–
ইঞ্জিনিয়ার সাগরচন্দ্র (নাম সাগরমলও উল্লেখ রয়েছে) একজন দৃঢ় নিষ্ঠ নাস্তিক
ছিলো। তার নিজের জ্ঞানের উপর বিশাল দম্ভ ছিল আর সবাইকে বলে বেড়াতো সে ১৪০০
বই অধ্যয়ন করে সে নাস্তিক হয়েছে। কিন্তু যখন সে মহর্ষির যুক্তিতর্কের
সম্মুখীন হয়, তখন সে নিরুত্তর হয়ে পড়ে। তিনদিন তার সাথে আলোচনা চলে এবং
অবশেষে সে ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করতে বাধ্য হয়। এতোকাল নাস্তিক পরিচয়
দেয়া সেই ব্যক্তি এতোটাই ঈশ্বরভক্ত ও মহর্ষির অনুগামী হয় যে যখন প্রথম
বেদভাষ্য ছাপানো হয়, সে-ই তার প্রথম গ্রাহক হয়।
২) রাজাদের নাস্তিক্য ভ্রান্তি নিবারণ ও আস্তিকতা স্থাপন–
একদিন কাশীতে মহারাজা ভরতপুর, মহারাজা রীবাং, মহারাজা তিরবা ও এক ইংরেজ এই
চারজন মহর্ষি নিকট উপস্থিত হয় ও নাস্তিকতার পক্ষে নিজেদের মতপ্রকাশ করতে
থাকে। আর বলে যে তাদের কোনো মজহব বা মত নেই। এসব শুনে মহর্ষি বলেন এটিই হল
তোমার মজহব। অর্থাৎ ঈশ্বরের অবিশ্বাস ও অস্তিত্বের অস্বীকার করাও একপ্রকার
অন্ধবিশ্বাসের মতবাদ। অতঃপর তিনি তাদের ঈশ্বর সত্ত্বা সম্পর্কে উত্তমরূপে
বুঝাতে লাগলেন এবং সর্বশেষে তারা সকল উত্তর পেয়ে অত্যন্ত প্রসন্নচিত্তে
ফিরে গেলেন।
৩) নাস্তিক বেশে আসা মুসলমানের পরাজয়ের পর পলায়ন–
একদিন এক মুসলমান নাস্তিক সেজে আসে আর পুনর্জন্মের উপর প্রশ্ন করতে থাকে।
সে তেমন শিক্ষিত ছিল না ফলে মহর্ষির কথা সে বুঝতে অসমর্থ ছিল। মহর্ষি তাকে
উপদেশ দেয় যে তুমি কোনো শিক্ষিত মুসলমানকে সাথে নিয়ে এসো তখন এবিষয়ে আলোচনা
করা যাবে। পরেরদিন সে এক মওলবীকে সাথে নিয়ে আসে। মহর্ষি তাদের নিকট বহু
যুক্তি দ্বারা পুনর্জন্ম প্রমাণ করেন। না সেই মওলবী আর না সেই যুবক কেউ তার
যুক্তির কোনো উত্তর পারলো না। অবশেষে তারা এই বলে চলে গেল যে আমাদের শঙ্কা
এখনো দূর হয়নি ও উত্তরে সন্তুষ্ট হইনি। কাল আবার আসবে এও প্রতিশ্রুতি দেয়।
কিন্তু পরেরদিন তারা আর এলো না।
এভাবেই নাস্তিক বেশধারী মুসলমানের আক্ষেপ চূর্ণ করেন মহর্ষি দয়ানন্দ।
৪) বাঙালি ঘোর নাস্তিক থেকে যজ্ঞকর্তা আস্তিক–
কিছু দুরাচারী মুসলমানেরা মহর্ষির প্রাণহরণের চেষ্টা করেছিল। সেখান থেকে
মহর্ষিকে রক্ষা করেন মাধবচন্দ্র চক্রবর্তী নামক এক বাঙালী ব্যক্তি।
মাধবচন্দ্র
চক্রবর্তী জন্মগত জাতিতে একজন ব্রাহ্মণ ছিলেন। কিন্তু সনাতন ধর্ম থেকে তার
বিশ্বাস উঠে গিয়েছিল আর ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাসকেও তিনি ত্যাগ করেছিলেন।
মদ্য-মাংস সেবন ছিল তার নিত্যদিনের কর্ম। এমনকি তিনি এক বেশ্যাকেও তার সাথে
রাখতেন। তবে তিনি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিত ছিলেন। ফারসি সহ বিভিন্ন
ভাষার জ্ঞান ছিল তার। তিনি নিজেকে অনেক বড় তার্কিক ব্যক্তি মনে করতেন এবং
তার তর্কবিদ্যার উপর অনেক দম্ভ ছিল। তিনি জনসম্মুখে ঘোষণা করতেন যে তার
যুক্তিকে কেউ খণ্ডন করতে পারবে না। তিনি তার ১০১টি প্রশ্নের একটি তালিকা
তৈরি করে রেখেছিলেন। যখনই কোনো প্রসিদ্ধ ধর্মীয় গুরু প্রয়াগে আসতেন, তিনি
তার প্রশ্নগুলো নিয়ে তাদের নিকট উপস্থিত হতেন এবং তাদেরকে নিরুত্তর করে
স্বগৌরবে ফিরে আসতেন।
মহর্ষির
আগমনের কথা শুনে তিনি পৌছে যান তার নিকট এবং তার চেনাপরিচিত পন্থায় তার
সেই ১০১ টি প্রশ্ন তুলে ধরেন। কিছুক্ষণে মধ্যেই তিনি বুঝে গেলেন যে তর্কে
মহর্ষি সম্মুখে টিকে থাকা কঠিন কাজ। আলোচনা কিছুদূর গড়ানোর পর তার
তর্কশক্তি হার মানে এবং তার সমস্ত গৌরব চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। ফলে যার হৃদয়
এতোদিন অবিশ্বাস ও অশ্রদ্ধার অন্ধকারে আচ্ছাদিত ছিল, তা আজ সত্য ও
শ্রদ্ধার আলোয় আলোকিত হতে লাগলো। সর্বশেষে তিনি মহর্ষির শিক্ষা ও উপদেশ
গ্রহণ করেন এবং তার নির্দেশে সন্ধ্যা ও বলিবৈশ্বদেব যজ্ঞ পালন করতে থাকে।
সেই
দুরাচারী মাধব বাবুর জীবনে বিশাল পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল। তিনি তার সকল
বদভ্যাস ত্যাগ করে প্রতিদিন ব্রহ্মমুহুর্তে উপাসনা ও হবন করতে লাগলেন।
ধার্মিক দৃষ্টিকোণে এ যেন তার নতুন জন্ম ছিল। তার এই অস্বাভাবিক পরিবর্তন
দেখে তার পরিচিতরাও অবাক হতেন।
এভাবেই মহর্ষির তার্কিক শক্তি ও উপদেশ একজন দৃঢ় নাস্তিককেও সদাচারী আস্তিকে পরিণত করে।
৫) নাস্তিক মুন্সিরাম থেকে কালজয়ী ধর্মনেতা স্বামী শ্রদ্ধানন্দ–
সেইসময় বরেলিতে শহর পুলিশ কর্মকর্তার সন্তান ছিল মুন্সিরাম। কাশী কলেজের
মেধাবী ছাত্র মুন্সিরাম ঘোর নাস্তিক ছিলেন। সংস্কৃত ভাষার প্রতি
অশ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং মনে করতেন এই ভাষা দ্বারা কোনো বৌদ্ধিক কর্ম সম্ভব
নয়। পিতা একনিষ্ঠ মূর্তিপূজক ভক্ত ছিলেন কিন্তু সন্তানের এই নাস্তিকতার কথা
জেনেও তিনি ছিলেন নিরুপায়। মহর্ষিরও আগমন ঘটেছিল কিছুদিন হয়। তিনি প্রথম
যখন তার প্রবচন শুনেন, ঘরে ফিরে তার পুত্রকেও সেখানে যাওয়ার নির্দেশনা দেন।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও পিতার আদেশ পালন করতে মুন্সিরাম যায় প্রবচনের দ্বিতীয়
দিনে। সেইদিন মহর্ষি ঈশ্বর বিষয়ক ও ও৩ম্ এর ব্যাখ্যা করছিলেন। এক সংস্কৃত
বলা সাধু কি এমন বৌদ্ধিক কথা বলবে এমন তাচ্ছিল্য নিয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত
হয়ে মহর্ষির বিশাল ঐশ্বর্যময় প্রতিমূর্তি দেখেই তার অশ্রদ্ধা লোপ পেতে
থেকে। প্রবচন চলাকালীন অবস্থায় তার অনিচ্ছা আগ্রহে রূপান্তরিত হতে থাকে।
এরপর নিয়মিত প্রতিদিন মুন্সিরাম প্রবচন সভায় উপস্থিত থাকতেন ও প্রশ্ন
করতেন। তিনদিন পর্যন্ত সভায় উপস্থিত থেকে মুন্সিরাম ঈশ্বর বিষয়ক প্রশ্ন
করতে লাগলেন, কিন্তু ৫ মিনিটের মধ্যেই মহর্ষি বৌদ্ধিক ও তার্কিক উত্তরে
তিনি নিরুত্তর হয়ে পড়লেন। প্রতিদিনই এমন প্রশ্নোত্তর চলতো আর শেষে
মুন্সিরাম এটিই বলতেন যে মহারাজ আপনার বুদ্ধি অনেক তীক্ষ্ণ, আপনি আমাকে
নিরুত্তর তো করে দিলেন কিন্তু আমার মনে ঈশ্বর নিয়ে বিশ্বাস তৈরি করতে
পারলেন না। একদিন পুনরায় তিনি একই বাক্য বলায় মহর্ষি হাসি দিলেন এবং বললেন,
দেখো তুমি প্রশ্ন করেছ আমি উত্তর দিয়েছি, এটা যুক্তির বিষয় ছিল। কিন্তু
আমি তোমাকে ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস নিয়ে আসবো এমন প্রতিশ্রুতি তো দেইনি।
তোমার ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস সেইদিনই আসবে যখন ঈশ্বরের কৃপা তুমি প্রাপ্ত
হবে।
এভাবেই
এক ঘোর নাস্তিকের সমগ্র শঙ্কা নিরাবরণ তথা নিরুত্তর করে তাকে আস্তিকতার
মার্গদর্শন করান। আর সেই নাস্তিক মুন্সিরামই পরে হয়ে উঠেন মহর্ষির অনন্য
শিষ্য কালজয়ী কর্মযোগী স্বামী শ্রদ্ধানন্দ।
৬) যার মৃত্যুও নাস্তিকের মনে আস্তিকতার উদয় ঘটায়–
পণ্ডিত গুরুদত্ত বিদ্যার্থী অস্বাভাবিক মেধাবী এক অনন্য রত্নের নাম যিনি
তার ২৬ বছর বয়সে শিক্ষা ও সাহিত্য জীবনে অসামান্য সাফল্য অর্জন করেছে। তিনি
হিন্দি, সংস্কৃত, ফারসি, উর্দু, ইংরেজি সহ বহু ভাষায় পারদর্শী ছিলেন।
বিজ্ঞানের শাখায় তার গবেষণাকার্য ও লেখনীও ছিল প্রশংসনীয়। এই অত্যন্ত
মেধাবী যুবক তার প্রারম্ভিক জীবনে ছিলেন একজন নাস্তিক। মহর্ষি দয়ানন্দের
শিক্ষা তার নাস্তিক্য নাশ করতে থাকে৷ তবে তার সমগ্র নাস্তিকতা চূর্ণ হয়
মহর্ষির দেহত্যাগের সময়। একাধিকবার বিষ প্রয়োগের পর শয্যাশায়ী মহর্ষি তার
অন্তিম সময় বুঝতে পেরে সকলকে তার কাছে ডেকে পাঠান। সকলে উপস্থিত হলে তাদের
উপদেশ দিয়ে ঈশ্বরস্তুতি ও আনন্দের সহিত গায়ত্রী পাঠ করে কিছু সময় সমাধিস্থ
থেকে চোখ খুললেন আর বলতে লাগলেন হে ঈশ্বর তোমার এই ইচ্ছা! হে ঈশ্বর তোমার
এই ইচ্ছা! তোমার ইচ্ছা পূর্ণ হোক। এই বলে তিনি এক পাশ হয়ে শুলেন এবং এক
দীর্ঘশ্বাস নিয়ে দেহত্যাগ করলেন। গুরুদত্ত এই দৃশ্য দেখে তার মধ্যে থাকা
অবশিষ্ট নাস্তিক্য সম্পূর্ণ দূর হয়ে যায়। তিনি ভাবলেন একজন যোগী কিভাবে
ঈশ্বর ভক্তিবলে মৃত্যুকেও জয় করতে পারে। এই ঘটনাই তার মনের সকল শঙ্কা দূর
করে এবং তাকে একনিষ্ঠ ঈশ্বর ভক্ত করে তোলে।
মহর্ষির
প্রবচন ও শিক্ষার পাশাপাশি তার জীবনাচরণ এমনকি মৃত্যুও কোনো নাস্তিকের
মনকে আন্দোলিত করে তুলেছিল। কারো মৃত্যুর দৃশ্যও কারো সমগ্র জীবনকে বদলে
দিতে পারে, এমন কার্য শুধু ভগৎপাদ দয়ানন্দ সরস্বতীর ক্ষেত্রেই সম্ভব ছিল।
মহর্ষি
তার গুরুর দেয়া আদেশে তার জীবনের প্রতিটা কর্মকেই করেছেন জগতের জন্য
সমর্পিত। তার প্রবচন থেকে মৃত্যু এই সমাজে সবেরই ছিল প্রবল প্রভাব। তিনি
যেন এক আধ্যাত্মিক চিকিৎসক যিনি ধর্মোপদেশের ঔষধি দিয়ে যেমন এই রোগাক্রান্ত
জাতি তথা রাষ্ট্রকে সুস্থ করে তুলেছেন, আবার কুসংস্কার ও অবৈদিকতার
খণ্ডনের অস্ত্রোপচারের দ্বারাও সমাজ সংস্কার করেছেন। তার এই অসামান্য
বলিদান ও কৃতিত্বের জন্য সনাতনী সমাজ আজীবন কৃতজ্ঞতার সহিত তাকে স্মরণ করে
যাবে।
জয়তু মহর্ষি দেব দয়ানন্দ সরস্বতী 
বাংলাদেশ অগ্নিবীর
সত্য প্রকাশে নির্ভীক সৈনিক
