সনাতন
ধর্মের রক্ষার উদ্দেশ্যে প্রবর্তিত শুদ্ধি ছিল মহর্ষি স্বামী দয়ানন্দ
সরস্বতীর একেবারেই নতুন, মৌলিক ও বিপ্লবাত্মক অবদান। এর উদ্ভব-ইতিহাস
অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং এই বিষয়টি স্পষ্ট করে যে, স্বামীজি কীভাবে তাঁর
সময়ের পরিস্থিতিকে গভীরভাবে অনুধাবন করে মৌলিক চিন্তা করতেন এবং তৎকালীন
সামাজিক সমস্যার সমাধানের জন্য নতুন পথ অনুসন্ধান করতেন। শুদ্ধি-র ভাবনা
সর্বপ্রথম স্বামীজির মনে উদয় হয় তাঁর পাঞ্জাব সফরের সময়। সেই সময়
খ্রিস্টান প্রচারকেরা হিন্দু, শিখ ও মুসলমানদের নিজেদের মতবাদের অনুসারী
করার জন্য ব্যাপক ও সংগঠিত প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল, পাশাপাশি আবার মুসলিমরাও
প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল। তাদের উপর ছিল রাষ্ট্রের শক্তিশালী পৃষ্ঠপোষকতা।
উপরন্তু আমেরিকা, ইংল্যান্ড প্রভৃতি দেশ থেকে তারা প্রচুর আর্থিক সহায়তাও
পেত। এই কারণেই তারা হিন্দু ধর্মের জন্য এক গুরুতর বিপদের রূপ নিয়েছিল।
স্বামী দয়ানন্দ এই সংকটকে প্রথম তীব্রভাবে পাঞ্জাবেই অনুভব করেন এবং তার
প্রতিকারের উপায় হিসেবে শুদ্ধির পথ নির্দেশ করেন।
শুদ্ধির
ধারণা ভারতীয় সমাজে অত্যন্ত প্রাচীন ছিল। কিন্তু মহর্ষি দয়ানন্দ যে অর্থে
এই শব্দটি ব্যবহার করেন, তা ছিল সম্পূর্ণ নতুন। ‘শুদ্ধি’ শব্দের মূল অর্থ
মলিনতা দূর করা ও পরিশুদ্ধ করা। ভগবান মনু এই অর্থেই শব্দটি ব্যবহার করে
লিখেছেন “অদ্ভির্গাত্রাণি শুধ্যন্তি”[৫.১০৯], অর্থাৎ জল দ্বারা দেহের
শুদ্ধি হয়। পূর্বে ধর্মীয় কর্ম সম্পাদনের আগে দেহশুদ্ধিকে অপরিহার্য মনে
করা হতো। ক্রমে ক্রমে ‘শুদ্ধি’ শব্দের অর্থ বিস্তৃত হতে থাকে এবং বিভিন্ন
ধর্মীয় কর্মকাণ্ড সম্পাদনের পূর্বে যে পবিত্রতা অর্জনের বিধি-বিধান পালন
করা হতো, তাকেই শুদ্ধি বলা শুরু হয়। ধীরে ধীরে মধ্যযুগীয় হিন্দু সমাজে এই
ধারণা গড়ে ওঠে যে, বিধর্মীদের সংস্পর্শে এলে কিংবা সমুদ্রযাত্রা করলে
মানুষ পাপী হয়ে যায়। এর প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ নানা শুদ্ধি-বিধানের প্রচলন
হয়। ষোড়শ শতকে যারা ইংল্যান্ড প্রভৃতি সমুদ্রপারের দেশে যেতেন, তাদের
ম্লেচ্ছ-সংস্পর্শের কারণে পতিত বলে গণ্য করা হতো এবং পঞ্চগব্য দ্বারা তাদের
শুদ্ধি করা হতো। স্বামীজি এবং তৎকালীন বহু চিন্তাবিদ এই ব্যবস্থার বিরোধী
ছিলেন। ভগবৎপাদ দয়ানন্দের মতে, প্রাচীনকালে ভারতের বিদেশের সঙ্গে ব্যাপক
যোগাযোগ ছিল এবং এই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ফলেই আর্যাবর্তের অবনতি
ঘটেছে। অতএব তিনি ‘শুদ্ধি’ শব্দটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করেন
খ্রিস্টান ও মুসলমান মতবাদ গ্রহণকারী ব্যক্তিদের পুনরায় নিজ ধর্মে দীক্ষিত
করার একটি পদ্ধতি বোঝাতে।
যুগদ্রষ্টা
ঋষি দয়ানন্দের সামনে প্রায় সেই পরিস্থিতিই উপস্থিত হয়েছিল, যা সিন্ধুতে
আরব আক্রমণের সময় কথিত দেবলস্মৃতির রচয়িতার সামনে এসেছিল। সে সময় ভারতের
এক অংশে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, আর এখন সমগ্র দেশেই খ্রিস্টানদের
শাসন ছিল। তাদের প্রচারকেরা আধুনিক সকল উপায় ব্যবহার করে অত্যন্ত
দ্রুতগতিতে হিন্দুদের মধ্যে খ্রিস্টমতের প্রচার চালাচ্ছিল এবং শাসকদের
শক্তিশালী সমর্থনও তারা লাভ করছিল। এই অবস্থায় স্বামী দয়ানন্দ যখন
পাঞ্জাবে পৌঁছান, তখন তাঁর কাছে এই সংকটের প্রতিকার শুদ্ধির মাধ্যমেই করা
একান্ত প্রয়োজনীয় বলে প্রতীয়মান হয়।
পাঞ্জাবে
শুদ্ধির প্রশ্ন সর্বপ্রথম স্বামী দয়ানন্দের সামনে আসে লুধিয়ানায়। এখানে
আমেরিকার প্রেস্বিটেরিয়ান মিশন ১৮৩৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং পরের
বছরই তারা একটি হাই স্কুল স্থাপন করে। অচিরেই এই স্থান খ্রিস্টান
প্রচারকদের কর্মকাণ্ডের একটি প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এখানকার মিশন স্কুলে
রামশরণ নামক এক ব্রাহ্মণ শিক্ষকতা করতেন। স্বামীজি যখন লুধিয়ানায়
পৌঁছান, তখন রামশরণ খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কয়েকজন হিন্দু
স্বামীজির দৃষ্টি এদিকে আকর্ষণ করেন এবং রামশরণের ধর্মান্তর রোধ করার
অনুরোধ জানান। স্বামীজি রামশরণকে ডেকে উপদেশ দেন এবং কিছু বিষয় তাকে
বোঝান। এতে প্রভাবিত হয়ে রামশরণ খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত
নেয়।
পাঞ্জাবে স্বামী দয়ানন্দের সামনে এ ধরনের বহু সমস্যা আসতে থাকে, ফলে তিনি
বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেন। জালন্ধরে তিনি শুদ্ধি বিষয়ে একটি
বক্তৃতা দেন এবং এক খ্রিস্টানের শুদ্ধি সম্পন্ন করেন। খড়গসিংহ নামক এক
ব্যক্তি স্বামীজির প্রভাবে খ্রিস্টধর্ম ত্যাগ করেন। তাকে অমৃতসরের
রেভারেন্ড ক্লার্ক খ্রিস্টান করেছিলেন। খ্রিস্টান হওয়ার আগে তিনি সাধু
ছিলেন এবং খ্রিস্টধর্ম সম্পর্কে তাঁর নানা সন্দেহ ছিল। তিনি লিখেছেন,
“এই
সময় আমি পুনরায় স্বামী দয়ানন্দের সঙ্গে মিলিত হলাম। এর আগেও আমাদের
সাক্ষাৎ হয়েছিল, যখন আমরা দু’জনেই ফকির বা সন্ন্যাসী ছিলাম। তিনি আমাকে
বললেন যে আমি বেদের অর্থ সঠিকভাবে বুঝতে পারিনি। মোক্ষলাভের জন্য তিনি
আমাকে যোগাভ্যাসের পরামর্শ দেন। কিছু সময় আমি তাঁর অনুসরণ করি; আমি আর্য
হয়ে যাই এবং খ্রিস্টানরা আমাকে ত্যাগ করে।”
অমৃতসরে
স্বামীজির শেষ অবস্থানের সময় তিনি জানতে পারেন যে, সেখানকার মিশন স্কুলের
চল্লিশজন ছাত্র খ্রিস্টধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। তারা এখনও
আনুষ্ঠানিকভাবে বাপ্তিস্ম [Baptism বা অপ্সুদীক্ষা] গ্রহণ করেনি, কিন্তু
নিজেদের ‘বাপ্তিস্মবিহীন খ্রিস্টান’ বলে পরিচয় দিত। তারা ‘প্রার্থনা
পরিষদ’ নামে একটি সংগঠনও গড়ে তুলেছিল। স্বামীজির প্রচারের এই যুবকদের উপর
গভীর প্রভাব পড়ে এবং তাদের চিন্তাধারায় পরিবর্তন আসতে থাকে। এতে সেখানকার
যাজক রেভারেন্ড বেয়ারিং অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হন। স্বামীজির প্রভাব খণ্ডন
করার জন্য তিনি বারো বছর ধরে খ্রিস্টান হওয়া পণ্ডিত খানসিংহের সঙ্গে
স্বামী দয়ানন্দের শাস্ত্রার্থের আয়োজন করেন। কিন্তু খানসিংহ যখন
স্বামীজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, তখন তিনি এতটাই প্রভাবিত হন যে খ্রিস্টধর্ম
ত্যাগ করে পুনরায় হিন্দু হন এবং স্বামীজির অনুসারী হয়ে ওঠেন। এই অবস্থা
রেভারেন্ড বেয়ারিংয়ের কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে। তখন তিনি স্বামীজির
মোকাবিলায় কলকাতার প্রসিদ্ধ খ্রিস্টান প্রচারক রেভারেন্ড কে. এন.
ব্যানার্জিকে আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু কন্যার অসুস্থতার কারণে ব্যানার্জি
কলকাতা থেকে আসতে পারেননি। এই সময় আরও কয়েকজন খ্রিস্টান খ্রিস্টধর্ম
ত্যাগ করে শুদ্ধির মাধ্যমে পুনরায় সনাতন ধর্মে দীক্ষিত হন।
পাঞ্জাবে আরও একটি ঘটনা মহর্ষি দয়ানন্দের শুদ্ধি-ভাবনাকে দৃঢ় ও উৎসাহিত
করে। পাঞ্জাব সফরের সময়ই স্বামী দয়ানন্দ আমেরিকা থেকে থিওসফিস্টদের প্রথম
চিঠি পান, যেখানে তারা লেখেন যে পশ্চিমের বহু খ্রিস্টান খ্রিস্টমতে
সন্তুষ্ট নন এবং তাদের ধর্মপিপাসা নিবারণের জন্য তারা আর্য ধর্মের দিকে
আকৃষ্ট হচ্ছেন। জর্ডান্সের মতে, এই সংবাদও স্বামীজিকে খ্রিস্টানদের সনাতন
ধর্মে আনতে অনুপ্রাণিত করেছিল।
শুদ্ধি
প্রসঙ্গে আর্যসমাজ ও ব্রাহ্মসমাজের তুলনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
ব্রাহ্মসমাজের নেতাদের সামনেও হিন্দুদের খ্রিস্টান হয়ে যাওয়ার সমস্যা
উপস্থিত হয়েছিল, কিন্তু তারা এ বিষয়ে না কোনো মৌলিক চিন্তা করেছিলেন, না
কার্যকর সমাধান খুঁজে পেয়েছিলেন। তাদের গৃহীত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থাও
ফলপ্রসূ হয়নি। ১৮৩০ সালে প্রসিদ্ধ স্কটিশ মিশনারি আলেকজান্ডার ডাফ
কলকাতায় আসেন এবং একটি মিশন স্কুল স্থাপন করেন। ইংরেজি শিক্ষার ব্যাপক
চাহিদা থাকা সত্ত্বেও, খ্রিস্টান যাজকদের প্রতি বাঙালিদের অবিশ্বাস এতটাই
গভীর ছিল যে রাজা রামমোহন রায়ের সহায়তা ছাড়া ডাফ স্কুল খুলতে পারেননি
এবং প্রথমে মাত্র ছয়জন ছাত্র সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন।
১৮৪৫ সালে এই স্কুলের ছাত্র উমেশচন্দ্র সরকার তাঁর স্ত্রীসহ খ্রিস্টমত
গ্রহণ করলে কলকাতায় প্রবল চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। তখন ব্রাহ্মসমাজের নেতা
ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। উমেশচন্দ্রের পিতা দেবেন্দ্রনাথের পরিবারের
তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ইউনিয়ন ব্যাংকে কাজ করতেন। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
খ্রিস্টধর্মের বিপদের মোকাবিলার জন্য কলকাতার প্রধান হিন্দুদের সংগঠিত করেন
এবং ডাফের স্কুলের বিরোধিতায় আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাঁর আহ্বানে অনুষ্ঠিত
এক সভায় খ্রিস্টধর্মের মোকাবিলার উদ্দেশ্যে একটি স্কুল স্থাপনের জন্য
বত্রিশ হাজার টাকা চাঁদা সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে দশ হাজার টাকা দেন
কলকাতার ধনকুবের বাবু আশুতোষ দেব। এই অর্থে হিন্দু স্টুডেন্টস স্কুল
প্রতিষ্ঠিত হয়। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও হরিমোহন সেন এই বিদ্যালয়ের
ব্যবস্থাপক নিযুক্ত হন। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে
যায়, কারণ যে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে এর অর্থ জমা ছিল, তা দেউলিয়া হয়ে
যায়।
এই ঘটনার সঙ্গে লুধিয়ানার মিশন স্কুলের রামশরণের ঘটনার তুলনা করলে স্পষ্ট
হয়ে ওঠে যে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও স্বামী দয়ানন্দের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে
মৌলিক পার্থক্য ছিল। স্বামীজি রামশরণকে উপদেশ দিয়ে বোঝান এবং খ্রিস্টান
হয়ে যাওয়া হিন্দুদের পুনরায় নিজ ধর্মে ফিরিয়ে আনার জন্য শুদ্ধির এক
নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। ব্রাহ্মসমাজের নেতারা এমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা
গ্রহণ করতে পারেননি; তাই তারা খ্রিস্টমতের সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থ হন।
পাঞ্জাবে
স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী যে শুদ্ধি-কার্য শুরু করেছিলেন, তা ক্রমাগত
বিস্তার লাভ করে। এর ফলেই দেরাদুনের এক প্রসিদ্ধ ও সমৃদ্ধ পরিবারের দুই
পুত্রকে খ্রিস্টান হওয়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়। দেরাদুন আর্যসমাজ
প্রতিষ্ঠার বিবরণে এই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। ১৮৭৯ সালের এপ্রিল মাসে মহর্ষি
যখন দেরাদুনে ধর্মপ্রচার করছিলেন, তখন জন্মসূত্রে এক মুসলমান মুহাম্মদ উমর
নিয়মিত তাঁর উপদেশ শুনতে আসতেন। তিনি সহারানপুরের বাসিন্দা হলেও ঠিকাদারির
কাজে দেরাদুনে থাকতেন। মহর্ষির বক্তৃতায় তিনি এতটাই প্রভাবিত হন যে বৈদিক
ধর্মে দীক্ষা নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তাঁকে শুদ্ধ করে হিন্দু (আর্য)
করা হয় এবং তাঁর নতুন নাম রাখা হয় অলখধারী। বলা হয়, এই শুদ্ধি স্বয়ং
মহর্ষিই সম্পন্ন করেছিলেন। বহু শতাব্দী পরে এই প্রথম কোনো জন্মসূত্রে
মুসলমানের জন্য বৈদিক ধর্ম ও আর্যত্বের পথ উন্মুক্ত হয়। মহর্ষির প্রতিভা ও
প্রচেষ্টায় আর্যধর্মে সেই শক্তির সঞ্চার শুরু হয়, যার দ্বারা
প্রাচীনকালে বহু বিদেশি ও বিধর্মী জাতিকে আর্য করা সম্ভব হয়েছিল।
মহর্ষি
দয়ানন্দের জীবদ্দশায় আরও বহু বিধর্মী নারী-পুরুষ শুদ্ধির মাধ্যমে
আর্যসমাজে অন্তর্ভুক্ত হন। এর মধ্যে একটি শুদ্ধি আজমেরে সম্পন্ন হয়, যার
ফলে এক খ্রিস্টান নারী তাঁর দুই সন্তানসহ বৈদিক ধর্ম গ্রহণ করেন। আজমের
আর্যসমাজের মন্ত্রী পণ্ডিত কমলনয়ন শর্মা ১৮৮৩ সালের ৩১ আগস্ট মহর্ষিকে
লেখা এক পত্রে জানান যে, ২৬ আগস্ট রাখিবন্ধনের দিনে সরদার ভগতসিংহ ও পণ্ডিত
ভাগরাম প্রমুখ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির উপস্থিতিতে ওই খ্রিস্টান নারী বৈদিক
ধর্ম গ্রহণ করেন, এতে সকলেই অত্যন্ত আনন্দিত হন। পরবর্তী পত্রে তিনি আরও
লেখেন,
“এই
নারীর বেদমত গ্রহণের ফলে এখানকার খ্রিস্টানদের মধ্যে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি
হয়েছে এবং খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাসীদের মধ্যেই সন্দেহের উদ্ভব হতে শুরু
করেছে। আশা করা যায়, এক বছরের মধ্যে আরও বহু খ্রিস্টান নারী ও পুরুষ বেদমত
গ্রহণ করবে।”
[মুন্শীরাম, ঋষি দয়ানন্দের পত্রব্যবহার, পৃ. ১৬৬]
বিধর্মীদের আর্যত্ব তথা বৈদিক সনাতন ধর্মে দীক্ষিত করার বিষয়ে মহর্ষি
দয়ানন্দের খ্যাতি এতটাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে, ১৮৭৬ সালের কুম্ভমেলায় তিনি
যখন হরিদ্বারে যান, তখন উমদ খাঁ নামক এক মুসলমান তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন,
‘সত্যিই কি আপনি মুসলমানদেরও আর্য করে থাকেন?’ উত্তরে মহর্ষি বলেন,
‘‘আর্য’ শব্দের অর্থ শ্রেষ্ঠ ও সত্যপথগামী ব্যক্তি। অতএব, যখন আপনি
সত্যধর্ম গ্রহণ করবেন, তখন আপনিও আর্য নামে অভিহিত হবেন।’
প্রকৃতপক্ষে মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী বৈদিক ধর্মের দ্বার সকলের জন্য
উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন এবং বহু বিধর্মী তাতে প্রবেশও করতে শুরু করেছিলেন।
তবে স্বীকার করতে হবে যে, তখনও হিন্দুদের গভীরমূল সংস্কার ও দৃঢ় বিশ্বাসে
এতটা পরিবর্তন আসেনি যে তারা মুসলমান ও খ্রিস্টানদের সহজে আত্মসাৎ করতে
পারবে। এর জন্য সময় ও নিরন্তর প্রচেষ্টার প্রয়োজন ছিল। তবুও এ কথা স্পষ্ট
যে, শুদ্ধির মাধ্যমে মহর্ষি দয়ানন্দ হিন্দু সমাজের হাতে এমন এক শক্তিশালী
উপায় তুলে দিয়েছিলেন, যার দ্বারা তারা নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করতে সক্ষম
হতে পারে।