মহর্ষি দয়ানন্দের দৃষ্টিতে ইতিহাসে হিন্দুর রাজনৈতিক পরাজয় ও তার কারণ
যখনই কোনো দেশ, জাতি বা সমাজের পরাভব ঘটে, তা কখনোই কোনো সুখকর ঘটনা নয়। আর্যাবর্তের ইতিহাসে এমন বহু সময় এসেছে, যখন আমরা নিজেদের পরাজিত, পদদলিত ও শোষিত বলে অনুভব করেছি। এই পরাজয়ের অর্থ কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতা হারানোই নয়; বরং আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও অক্ষুণ্ণ থাকতে পারেনি।
মহাভারতের যুগ থেকে শুরু করে ইংরেজ শাসনকাল পর্যন্ত বহুবার আমাদের আত্মসম্মান ও আত্মগৌরবের অনুভূতি বিসর্জন দিতে হয়েছে। এতসব সহ্য করার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো না কোনো কারণ রয়েছে।
‘স্বায়ম্ভুব রাজা থেকে পাণ্ডবদের সময় পর্যন্ত আর্যদের চক্রবর্তী রাজত্ব ছিল। পরবর্তীকালে পারস্পরিক বিরোধে লিপ্ত হয়ে তারা পরস্পর যুদ্ধ করে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।’ [1]
‘যখন ভাই ভাইকে হত্যা করতে শুরু করে, তখন ধ্বংস হওয়ার বিষয়ে আর কীই বা সন্দেহ থাকতে পারে?’ [2]
‘পারস্পরিক বিভেদের ফলে কৌরব–পাণ্ডব ও যাদবদের সম্পূর্ণ বিনাশ হয়েছে; সেটি তো হয়েই গেল, কিন্তু আজও সেই ব্যাধি আমাদের পিছু ছাড়েনি। কে জানে, এই ভয়ংকর রাক্ষস কবে আমাদের ছাড়বে, না কি আর্যদের সমস্ত সুখ থেকে বঞ্চিত করে দুঃখসাগরে নিমজ্জিত করেই মারবে।’ [3]
‘ঈশ্বর কৃপা করুন, যেন এই রাজরোগ আর্যদের মধ্য থেকে সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট হয়ে যায়।’ [4]
মহর্ষি দয়ানন্দের এই বিশ্লেষণমূলক বক্তব্যের আলোকে আমরা ভারতীয় ইতিহাসের একটি সংক্ষিপ্ত মূল্যায়নের চেষ্টা করব।
ভারতে মোগল শাসনকে স্থায়িত্ব দেওয়ার কৃতিত্ব আকবরের, যাঁর শাসনকাল ছিল ১৫৫৬–১৬০৫ খ্রিস্টাব্দ। বাবরের প্রতিষ্ঠিত মোগল সাম্রাজ্য হুমায়ুনের শাসনকালে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। অবস্থা এমন হয়েছিল যে আফগান শক্তির নেতৃত্বে ভার্গব বংশীয় এক সনাতনী সেনানায়ক হেম চন্দ্র তথা হেমু ‘বিক্রমাদিত্য’ উপাধি ধারণ করে নিজেকে দিল্লির সম্রাট ঘোষণা করেছিলেন।
জাতমাত্রে সুতে তস্মিন্বাগুবাচা শরীরিণী ।
অকস্মাচ্চ বরো জাতঃ পুত্রোঽয়ং সর্বভাগ্যবান্ ॥১৩
পৈশাচে দারুণে মার্গে ন ভূতো ন ভবিষ্যতি ।
অতঃ সোঽকবরো নাম হোমায়ুস্তনয়স্তব ॥১৪
স ভূপোঽকবরো নাম কৃত্বা রাজ্যমকণ্টকম্ ।
শতার্দ্ধেন চ শিষ্যৈশ্চ বৈকুণ্ঠভবনং যয়ৌ ॥৪৪
তিনি দ্বিতীয় শক্তির সহায়তা গ্রহণ করেন। কারণ ছিল, আর্য বংশোদ্ভূত রাজপুতরা পারস্পরিক বিভেদের কারণে কোনো স্বধর্মাবলম্বী রাজার অধীনতা স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিলেন না। তারা নিজেদের ভাই শত্রু রাজার অপমান ঘটানোর জন্য মোগলদের সঙ্গে অর্থনৈতিক-পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারতেন, কিন্তু ভাইয়ের কর্তৃত্ব মানতে চাইতেন না।
এদিকে আকবর তিনি অবাস্তব কল্পনা ভিত্তিতে এবং নিজেকে মহান হিসেবে দেখানোর জন্য এমন একটি ধর্ম গড়ে তোলার চেষ্টা করেন, যেখানে সব ধর্মের উত্তম উপাদান অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এর নাম দেন ‘দীন-ই-ইলাহি’; তবে আকবরের মৃত্যুর সঙ্গেই এই ধর্মেরও অবসান ঘটে। [6]
পরবর্তী সময়ে মারাঠা, শিখ, জাট ও রাজপুত শক্তি উত্থান লাভ করলেও পারস্পরিক ঐক্যের অভাবে এই শক্তিগুলো স্থায়ী হতে পারেনি। সত্যকেতু বিদ্যালঙ্কার বলেন—‘রাজনৈতিক ঐক্য ও জাতীয় চেতনার অভাবই আর্য রাজশক্তির স্থায়িত্ব নষ্ট করেছে।’ [8]
উপর্যুক্ত বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট যে, পারস্পরিক বিভেদ, আত্মগর্ব, জাতীয় ঐক্যের অভাব এবং বিদেশী দৃষ্টিভঙ্গির অন্ধ অনুকরণই ভারতীয় পরাভবের মূল কারণ।
মহর্ষি দয়ানন্দ এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য যে দোষগুলির নিরসন প্রয়োজনীয় বলে মনে করেছিলেন, সেগুলো হলো-পারস্পরিক বিভেদ, মতভেদ, ব্রহ্মচর্যের অভাব, অকাল বিবাহ, ভোগাসক্তি, মিথ্যাচার, বৈদিক শিক্ষার অবক্ষয়। [10]
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এই দোষগুলি বিদ্যমান থাকলে তৃতীয় বিদেশী এসে মধ্যস্থ হয়ে বসে।’ [11]
আজও এই কথাগুলি সমানভাবে প্রযোজ্য। মহর্ষি দয়ানন্দ নির্দেশিত পথ অনুসরণ না করলে আর্যাবর্তের স্বাধীনতার সূর্য আবার ম্লান হয়ে পড়বে।
[1] সত্যার্থপ্রকাশ, একাদশ সমুল্লাস।
[2] সত্যার্থপ্রকাশ, একাদশ সমুল্লাস।
[3] সত্যার্থপ্রকাশ, একাদশ সমুল্লাস।
[4] সত্যার্থপ্রকাশ, একাদশ সমুল্লাস।
[5] সত্যকেতু বিদ্যালঙ্কার, আর্যসমাজের ইতিহাস, খণ্ড ১।
[6] সত্যকেতু বিদ্যালঙ্কার, আর্যসমাজের ইতিহাস, খণ্ড ১।
[7] সত্যকেতু বিদ্যালঙ্কার, আর্যসমাজের ইতিহাস, খণ্ড ১।
[8] সত্যকেতু বিদ্যালঙ্কার, আর্যসমাজের ইতিহাস, খণ্ড ১।
[9] রামধারী সিং দিনকর, সংস্কৃতির চার অধ্যায়।
[10] সত্যার্থপ্রকাশ, দশম সমুল্লাস।
[11] সত্যার্থপ্রকাশ, দশম সমুল্লাস।
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর
