মহর্ষি দয়ানন্দের দৃষ্টিতে ইতিহাসে হিন্দুর রাজনৈতিক পরাজয় ও তার কারণ


✅ মহর্ষি দয়ানন্দের দৃষ্টিতে ইতিহাসে হিন্দুর রাজনৈতিক পরাজয় ও তার কারণ

যখনই কোনো দেশ, জাতি বা সমাজের পরাভব ঘটে, তা কখনোই কোনো সুখকর ঘটনা নয়। আর্যাবর্তের ইতিহাসে এমন বহু সময় এসেছে, যখন আমরা নিজেদের পরাজিত, পদদলিত ও শোষিত বলে অনুভব করেছি। এই পরাজয়ের অর্থ কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতা হারানোই নয়; বরং আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও অক্ষুণ্ণ থাকতে পারেনি।
 
মহাভারতের যুগ থেকে শুরু করে ইংরেজ শাসনকাল পর্যন্ত বহুবার আমাদের আত্মসম্মান ও আত্মগৌরবের অনুভূতি বিসর্জন দিতে হয়েছে। এতসব সহ্য করার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো না কোনো কারণ রয়েছে।
 
▪️মহর্ষি দয়ানন্দের দৃষ্টিতে এই সমস্যার মূল কারণ ছিল "পারস্পরিক বিভেদ"। তিনি বলেন,
‘স্বায়ম্ভুব রাজা থেকে পাণ্ডবদের সময় পর্যন্ত আর্যদের চক্রবর্তী রাজত্ব ছিল। পরবর্তীকালে পারস্পরিক বিরোধে লিপ্ত হয়ে তারা পরস্পর যুদ্ধ করে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।’ [1]
🔹তিনি আরও বলেন,
‘যখন ভাই ভাইকে হত্যা করতে শুরু করে, তখন ধ্বংস হওয়ার বিষয়ে আর কীই বা সন্দেহ থাকতে পারে?’ [2]
📍মহাভারতের যুদ্ধের পরেও আর্যরা এই ঘটনা থেকে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেনি, এই বিষয়ে মহর্ষি গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন। অন্যত্র তিনি বলেন,
‘পারস্পরিক বিভেদের ফলে কৌরব–পাণ্ডব ও যাদবদের সম্পূর্ণ বিনাশ হয়েছে; সেটি তো হয়েই গেল, কিন্তু আজও সেই ব্যাধি আমাদের পিছু ছাড়েনি। কে জানে, এই ভয়ংকর রাক্ষস কবে আমাদের ছাড়বে, না কি আর্যদের সমস্ত সুখ থেকে বঞ্চিত করে দুঃখসাগরে নিমজ্জিত করেই মারবে।’ [3]
🔹তিনি ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করেন,
‘ঈশ্বর কৃপা করুন, যেন এই রাজরোগ আর্যদের মধ্য থেকে সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট হয়ে যায়।’ [4]
▪️উপর্যুক্ত আলোচনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, মহর্ষি দয়ানন্দের মতে আর্যদের পরাভবের মূল কারণ ছিল পারস্পরিক কলহ ও বিদ্বেষভাব।
মহর্ষি দয়ানন্দের এই বিশ্লেষণমূলক বক্তব্যের আলোকে আমরা ভারতীয় ইতিহাসের একটি সংক্ষিপ্ত মূল্যায়নের চেষ্টা করব।
🔰ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম ভাগে মোগল আক্রমণকারী বাবর ভারত আক্রমণ করে দিল্লি–আগ্রা অঞ্চলের এক বৃহৎ অংশে নিজের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তুর্কি–আফগান শাসনের অবসান ঘটিয়ে তিনি যেভাবে মোগল সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, সে বিষয়ে এখানে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন নেই। ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দে বাবরের মৃত্যুর সময় পর্যন্ত মোগল শাসন পূর্বে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত, উত্তরে হিমালয় পর্যন্ত এবং দক্ষিণে মালওয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছিল। [5]
ভারতে মোগল শাসনকে স্থায়িত্ব দেওয়ার কৃতিত্ব আকবরের, যাঁর শাসনকাল ছিল ১৫৫৬–১৬০৫ খ্রিস্টাব্দ। বাবরের প্রতিষ্ঠিত মোগল সাম্রাজ্য হুমায়ুনের শাসনকালে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। অবস্থা এমন হয়েছিল যে আফগান শক্তির নেতৃত্বে ভার্গব বংশীয় এক সনাতনী সেনানায়ক হেম চন্দ্র তথা হেমু ‘বিক্রমাদিত্য’ উপাধি ধারণ করে নিজেকে দিল্লির সম্রাট ঘোষণা করেছিলেন।
▪️এই সংকটময় পরিস্থিতিতে আকবর কূটনৈতিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের পরিচয় দিয়ে মোগল শাসনের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করেন। আকবরকে দুটি রাজশক্তির সঙ্গে সংগ্রাম করতে হয়েছিল, একদিকে স্বমতাবলম্বী আফগান সামরিক শক্তি, অন্যদিকে বিধর্মী আর্য রাজপুত সামরিক শক্তি। আকবর যে হিন্দুদের আকৃষ্ট করতে সমর্থ হয়েছিলেন তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ ভবিষ্যপুরাণের প্রতিসর্গপর্বের চতুর্থখণ্ডের ২২তম অধ্যায়ে বর্ণিত, আকবরকে সরাসরি বৈকুণ্ঠগামী বলা হয়েছে সেখানে,
জাতমাত্রে সুতে তস্মিন্বাগুবাচা শরীরিণী ।
অকস্মাচ্চ বরো জাতঃ পুত্রোঽয়ং সর্বভাগ্যবান্ ॥১৩
পৈশাচে দারুণে মার্গে ন ভূতো ন ভবিষ্যতি ।
অতঃ সোঽকবরো নাম হোমায়ুস্তনয়স্তব ॥১৪
স ভূপোঽকবরো নাম কৃত্বা রাজ্যমকণ্টকম্ ।
শতার্দ্ধেন চ শিষ্যৈশ্চ বৈকুণ্ঠভবনং যয়ৌ ॥৪৪
তিনি দ্বিতীয় শক্তির সহায়তা গ্রহণ করেন। কারণ ছিল, আর্য বংশোদ্ভূত রাজপুতরা পারস্পরিক বিভেদের কারণে কোনো স্বধর্মাবলম্বী রাজার অধীনতা স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিলেন না। তারা নিজেদের ভাই শত্রু রাজার অপমান ঘটানোর জন্য মোগলদের সঙ্গে অর্থনৈতিক-পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারতেন, কিন্তু ভাইয়ের কর্তৃত্ব মানতে চাইতেন না।
⚠️ অন্যদিকে আফগান ও মোগলদের মতবাদ এক হলেও, সেই মতবাদ তাদের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করতে পারেনি। এই কারণেই আকবর রাজপুতদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করাকে অধিক যুক্তিযুক্ত মনে করেন। তিনি রাজপুতদের উচ্চপদে অধিষ্ঠিত করেন এবং তাদের সামরিক শক্তি ব্যবহার করে উত্তর ভারতে নিজের সাম্রাজ্য বিস্তার করেন। তবে মেবারের রাজা রানা প্রতাপ ছিলেন ব্যতিক্রম; তিনি আজীবন মোগল শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যান। আর্য ইতিহাসে মহারান প্রতাপের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়েছে।
এদিকে আকবর তিনি অবাস্তব কল্পনা ভিত্তিতে এবং নিজেকে মহান হিসেবে দেখানোর জন্য এমন একটি ধর্ম গড়ে তোলার চেষ্টা করেন, যেখানে সব ধর্মের উত্তম উপাদান অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এর নাম দেন ‘দীন-ই-ইলাহি’; তবে আকবরের মৃত্যুর সঙ্গেই এই ধর্মেরও অবসান ঘটে। [6]
⚫ বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, ইসলাম যেখানে যেখানে গিয়েছে, সিরিয়া, ইরান, ইরাক, মিশর প্রভৃতি দেশে সেখানে শাসকরা ইসলাম গ্রহণ করার পর অল্প সময়ের মধ্যেই সাধারণ জনগণও ইসলাম গ্রহণ করেছে। ভারতেও ব্যাপকভাবে চাপ-প্রয়োগ, অবর্ণনীয় অত্যাচার-অন্যায় করা হয় সনাতনীদের উপর। শত শত বছর ধরে শাসকশ্রেণি ইসলাম মতাবলম্বী হলেও, ভারতীয় জনগণ বৈদিক সনাতন ধর্মের প্রতি অনুগত থেকেছে নিজের প্রাণের বিনিময়ে হলেও। শুধু তাই নয়, মুসলিম সমাজও বৈদিক ধর্ম ও সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, যদিও তা কখনোই ইসলামের কোরআন-হাদিসের বিরুদ্ধে এবং ওয়াহাবিরা চিরকাল এই ছদ্ম সুফী প্রচারের মাধ্যমে ধর্মান্তরের ফলটা নিলেও সুফীদের স্বীকার করেনি। মধ্যযুগের ভক্তি আন্দোলন এবং ভারতীয় মতের উদারতা ~ এই দুই কারণ ইসলামের বিস্তার রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
🔹শাহজাহানের উত্তরসূরি ঔরঙ্গজেব মোগল সাম্রাজ্যকে শরীয়তি ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা করেন। তিনি জিজিয়া কর পুনরায় আরোপ করেন এবং কাশি, সোমনাথ, মথুরা প্রভৃতি প্রসিদ্ধ মন্দির ধ্বংসের আদেশ দেন। আর্যদের উৎসব প্রকাশ্যে পালন নিষিদ্ধ করেন, ইসলাম গ্রহণকারীদের পুরস্কৃত করেন এবং হিন্দুদের উচ্চপদ থেকে সরিয়ে মুসলমানদের নিযুক্ত করেন।
▪️এই সাম্প্রদায়িক নীতির ফলে মোগল সাম্রাজ্যের ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়ে। মথুরায় জাট, পাঞ্জাবে শিখ, রাজপুতানায় দুর্গাদাস রাঠোর এবং দক্ষিণে মারাঠারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এর ফলে ঔরঙ্গজেব ইসলামী রাষ্ট্র গঠনে ব্যর্থ হন এবং তাঁর সাম্রাজ্য ভাঙনের মুখে পড়ে। ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পর দুর্বল উত্তরসূরিরা পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হন।
পরবর্তী সময়ে মারাঠা, শিখ, জাট ও রাজপুত শক্তি উত্থান লাভ করলেও পারস্পরিক ঐক্যের অভাবে এই শক্তিগুলো স্থায়ী হতে পারেনি। সত্যকেতু বিদ্যালঙ্কার বলেন— ‘রাজনৈতিক ঐক্য ও জাতীয় চেতনার অভাবই আর্য রাজশক্তির স্থায়িত্ব নষ্ট করেছে।’ [8]
🔹রাষ্ট্রকবি দিনকর লিখেছেন, ‘ব্যক্তিবাদী বিষ এই যুগে আরও প্রবল হয়ে উঠেছিল; সমাজ ও দেশের প্রতি কর্তব্যবোধ মানুষ ভুলে গিয়েছিল।’ [9]
উপর্যুক্ত বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট যে, পারস্পরিক বিভেদ, আত্মগর্ব, জাতীয় ঐক্যের অভাব এবং বিদেশী দৃষ্টিভঙ্গির অন্ধ অনুকরণই ভারতীয় পরাভবের মূল কারণ।
মহর্ষি দয়ানন্দ এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য যে দোষগুলির নিরসন প্রয়োজনীয় বলে মনে করেছিলেন, সেগুলো হলো- পারস্পরিক বিভেদ, মতভেদ, ব্রহ্মচর্যের অভাব, অকাল বিবাহ, ভোগাসক্তি, মিথ্যাচার, বৈদিক শিক্ষার অবক্ষয়। [10]
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এই দোষগুলি বিদ্যমান থাকলে তৃতীয় বিদেশী এসে মধ্যস্থ হয়ে বসে।’ [11]
আজও এই কথাগুলি সমানভাবে প্রযোজ্য। মহর্ষি দয়ানন্দ নির্দেশিত পথ অনুসরণ না করলে আর্যাবর্তের স্বাধীনতার সূর্য আবার ম্লান হয়ে পড়বে।
 
🌸 তথ্যসূত্র:
[1] সত্যার্থপ্রকাশ, একাদশ সমুল্লাস।
[2] সত্যার্থপ্রকাশ, একাদশ সমুল্লাস।
[3] সত্যার্থপ্রকাশ, একাদশ সমুল্লাস।
[4] সত্যার্থপ্রকাশ, একাদশ সমুল্লাস।
[5] সত্যকেতু বিদ্যালঙ্কার, আর্যসমাজের ইতিহাস, খণ্ড ১।
[6] সত্যকেতু বিদ্যালঙ্কার, আর্যসমাজের ইতিহাস, খণ্ড ১।
[7] সত্যকেতু বিদ্যালঙ্কার, আর্যসমাজের ইতিহাস, খণ্ড ১।
[8] সত্যকেতু বিদ্যালঙ্কার, আর্যসমাজের ইতিহাস, খণ্ড ১।
[9] রামধারী সিং দিনকর, সংস্কৃতির চার অধ্যায়।
[10] সত্যার্থপ্রকাশ, দশম সমুল্লাস।
[11] সত্যার্থপ্রকাশ, দশম সমুল্লাস।

© বাংলাদেশ অগ্নিবীর


Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.