পরম সত্যের বাণী এবং তিন ডাকাতের হৃদয় পরিবর্তন!
একবার স্বামী দর্শনানন্দের দিল্লিতে ধর্ম-উপদেশ সভা চলছিল। এই ঘটনাটি সদর বাজার এবং পাহাড়ি ধীরজের মধ্যবর্তী স্থানের, যেখানে আজকাল 'বারো টুটি চক' [Bara Tooti Chowk] বিদ্যমান। কাছেই হাফিজ বান্নার সরাইখানা ছিল, যেখানে দূর-দূরান্তের যাত্রীরা তাদের বলদগাড়ি এনে দাঁড় করাত। সন্ধ্যার সময় ছিল। মানুষজন অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে স্বামীজির উপদেশ শুনছিল। উপদেশের বিষয় ছিল— কর্ম এবং কর্মফল। স্বামীজি বোঝালেন যে প্রতিটি মানুষকে তার নিজ কর্মের ফল অবশ্যই ভোগ করতে হয়। কর্মের ফলকে এড়ানো সম্ভব নয় এবং অন্য কারো কর্মের ফল দ্বিতীয় অন্য কেউ ভোগ করতে পারে না।
উপদেশ শ্রোতাদের মধ্যে রোহতক গ্রাম থেকে আসা তিনজন ব্যক্তিও উপস্থিত ছিলেন। ভাষণের পর সেই তিনজন ব্যক্তি স্বামীজির কাছে পৌঁছালেন এবং বললেন, "বাবাজী, আমরা আপনার সাথে নির্জনে কিছু কথা বলতে চাই।" তাঁরা তিনজনে স্বামীজিকে কাছের এক জঙ্গলে নিয়ে গেলেন। স্বামীজির মনে তাঁদের প্রতি কিছু আশঙ্কা বা সন্দেহ জাগতে লাগল, কিন্তু তখনই সেই তিনজন মাটিতে বসে পড়লেন এবং স্বামীজির বসার জন্য একটি চাদর বিছিয়ে দিলেন। তাঁরা আজকের উপদেশের বিষয়ে স্বামীজিকে নিজেদের কিছু প্রশ্নের কথা বললেন এবং সেগুলোর উত্তর লাভ করে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন।
এরপর তাঁদের একজন গম্ভীর হয়ে পুরো বিষয়টি খু্লে বললেন— "স্বামীজি, আমরা দারিদ্রের বশবর্তী হয়ে তিনজনেই ডাকাতি করব ভাবছিলাম। আমরা দিল্লিতে ডাকাতি করতে এসেছিলাম। কিন্তু আপনার উপদেশে আমাদের হৃদয় পরিবর্তন হয়ে গেছে। আজ থেকে আমরা এই চিন্তাই দিচ্ছি।" তাঁরা স্বামীজিকে অত্যন্ত আদর-সৎকার করলেন এবং তাঁকে তাঁর থাকার স্থানে পৌঁছে দিয়ে এলেন।
এই তিনজন ব্যক্তি সেই দিন থেকে সম্পূর্ণরূপে বদলে গেলেন। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রচুর সম্পদ আয় করেন। বলা বাহুল্য, তাঁরা আর্যসমাজে যোগ দিলেন এবং সমাজসেবার বড় বড় কাজ সম্পন্ন করলেন। এঁদের মধ্যে একজন ছিলেন চৌধুরী পীরু সিং, যিনি নিজের গ্রাম মাটিণ্ডুতে তাঁর ত্রিশ বিঘা জমি দান করে স্বামী শ্রদ্ধানন্দের মাধ্যমে গুরুকুল প্রতিষ্ঠা করিয়েছিলেন। দ্বিতীয় ব্যক্তি ছিলেন ফরমাণা গ্রামের লালা ইচ্ছারাম, যার সুযোগ্য পুত্র হরিশচন্দ্র বিদ্যালংকার এবং অধ্যাপক রামসিং আর্যসমাজের প্রখ্যাত নেতা ও বিদ্বান হয়েছিলেন। তৃতীয় ব্যক্তি ছিলেন ফরমাণা গ্রামেরই চৌধুরী জুগলাল জেলদার, যিনি নিজের বীরত্ব, নির্ভীকতা ও সমাজ-সংস্কারমূলক কাজের জন্য অত্যন্ত প্রসিদ্ধ হয়েছিলেন।
এটি সেই সময় ছিল যখন উপদেশ প্রদানকারী ব্যক্তিরাও সত্যবাদী হতেন এবং উপদেশ গ্রহণকারীরাও। আজ উপদেশ দেওয়ার মতো মানুষ হাজারে হাজারে রয়েছে এবং শোনার মতো মানুষ লাখে লাখে! কিন্তু তাদের মধ্যে হয়তো কদাচিৎ কারো জীবন এই প্রকারে পরিবর্তিত হয়, যেভাবে এই তিনজন ব্যক্তির জীবন বদলে গিয়েছিল।
[পণ্ডিত জগদেবসিং সিদ্ধান্তী (প্রাক্তন সংসদ সদস্য) রচিত বিবরণের ওপর ভিত্তি করে]
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর
