স্বামী শ্রদ্ধানন্দ : সমগ্র জীবন ও অবদানের একটি সুবিন্যস্ত পর্যালোচনা

 

💥স্বামী শ্রদ্ধানন্দ : সমগ্র জীবন ও অবদানের একটি সুবিন্যস্ত পর্যালোচনা💥
 
ঊনবিংশ শতাব্দীর রেনেসাঁ ও বিংশ শতাব্দীর জাতীয়তাবাদী চেতনার এক অনন্য সেতুবন্ধন ছিলেন স্বামী শ্রদ্ধানন্দ। পরাধীন ভারতের তিমিরঘন আকাশে তিনি ছিলেন সেই দীপশিখা, যিনি বৈদিক আদর্শের পুনর্জাগরণ এবং সমাজ সংস্কারের কঠিন ব্রত গ্রহণ করেছিলেন। মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীর মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে এক সফল আইনজীবী থেকে নিঃস্বার্থ সন্ন্যাসীতে রূপান্তরিত হওয়ার এই মহাকাব্যিক পথচলা কেবল আধ্যাত্মিক ছিল না, বরং তা ছিল শৃঙ্খলমুক্ত ভারতের এক বলিষ্ঠ স্বপ্ন। শিক্ষা, সমাজ ও ধর্মের ত্র্যহস্পর্শে তাঁর জীবন একাধারে যেমন ছিল কঠোর ত্যাগের, তেমনই ছিল অদম্য সাহসিকতার এক জীবন্ত উপাখ্যান।
 
☑️ ১. জন্ম ও পারিবারিক পরিচিতি
🔹 জন্ম তারিখ: ২২ ফেব্রুয়ারি, ১৮৫৬ খ্রি.।
🔹জন্মস্থান: তলওয়ান (Talwan), জেলা- জলন্ধর, পাঞ্জাব।
🔹 পারিবারিক নাম: মুন্সিরাম বিজ (Munshiram Vij)।
🔹 পিতা: লালা নানক চাঁদ (ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইউনাইটেড প্রভিন্স পুলিশে কর্মরত ছিলেন)।
🔹বাল্যকাল: পিতার চাকরির কারণে তাঁর শৈশব কেটেছে উত্তরপ্রদেশের বারাণসী ও বেরিলিতে।
↗️ ২. শিক্ষা ও ওকালতি জীবন (১৮৭৭ - ১৯০২ খ্রি.)
স্বামী শ্রদ্ধানন্দের শিক্ষাজীবন ছিল বৈচিত্র্যময়। তিনি আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষা এবং প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন চেয়েছিলেন।
🔸আইন শিক্ষা: তিনি লাহোর থেকে ওকালতি পাশ করেন।
🔹 পেশাগত জীবন: জলন্ধর ও ফিল্লৌরে (Phillaur) সফলভাবে ওকালতি করেন। সেই সময় তাঁর বার্ষিক আয় ছিল কয়েক হাজার টাকা, যা তৎকালীন সময়ে অত্যন্ত উচ্চবিত্তের লক্ষণ।
▪️ রূপান্তর: ১৮৮২ সালে বেরিলিতে মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীর সংস্পর্শে এসে তিনি মদ্যপান ও আমিষ ত্যাগ করেন এবং আর্য সমাজ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
☑️ স্বামী দয়ানন্দের প্রভাব: জীবন পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণ
​স্বামী শ্রদ্ধানন্দের (তখনকার মুন্সিরাম) জীবনে ১৮৮২ সাল ছিল এক মহাবিপ্লবের বছর। উত্তরপ্রদেশের বেরিলিতে মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীর সাথে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে।
▪️​নাস্তিকতা থেকে আস্তিকতা: তরুণ মুন্সিরাম তখন পাশ্চাত্য শিক্ষায় প্রভাবিত হয়ে ধর্মবিমুখ এবং কিছুটা উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন করছিলেন। দয়ানন্দের তর্করত্ন পাণ্ডিত্য এবং যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা তাঁর নাস্তিকতাকে চূর্ণ করে দেয়।
▪️​ব্যক্তিগত পরিবর্তন: দয়ানন্দের সংস্পর্শে আসার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে তিনি মদ্যপান, ধূমপান এবং আমিষ আহার চিরতরে ত্যাগ করেন।
▪️জীবন​মন্ত্রদান: দয়ানন্দ তাঁকে বলেছিলেন, "সত্যের পথ কঠিন, কিন্তু এটিই মুক্তির একমাত্র পথ।" এই একটি বাক্য মুন্সিরামকে একজন সফল আইনজীবী থেকে একজন ত্যাগী সমাজসেবীতে রূপান্তরিত করে।
🔸​আর্য সমাজের দায়িত্ব: দয়ানন্দের মৃত্যুর পর (১৮৮৩), তাঁর অসম্পূর্ণ কাজ অর্থাৎ বেদের প্রচার এবং শিক্ষা বিস্তারের ভার নিজের কাঁধে তুলে নেন মুন্সিরাম।
↗️৩. শিক্ষা বিপ্লব: গুরুকুল কাঙ্গড়ি (১৯০২)
স্বামী শ্রদ্ধানন্দ বিশ্বাস করতেন যে ব্রিটিশ প্রবর্তিত 'ক্লার্ক তৈরির শিক্ষা' ভারতের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। তাই তিনি প্রাচীন বৈদিক আদর্শে শিক্ষা ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করেন।
🔸প্রতিষ্ঠা: ৪ মার্চ, ১৯০২ সালে হরিদ্বারের কাছে কাঙ্গড়িতে গুরুকুল স্থাপন করেন।
🔸আর্থিক ত্যাগ: তিনি তাঁর নিজের সমস্ত সম্পত্তি (৪০,০০০ টাকা মূল্যের) এবং জলন্ধরের নিজস্ব প্রেস ও বসতবাড়ি এই গুরুকুলের জন্য দান করে দেন।
🔸 শর্তাবলী: গুরুকুলে ছাত্ররা ১০ বছর বয়স থেকে ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত ব্রহ্মচর্য পালন করত। তৎকালীন সময়ে এটি ছিল সম্পূর্ণ অবৈতনিক এবং কঠোর শৃঙ্খলাবদ্ধ।
▫️স্বীকৃতি: ১৯২১ সালে এই প্রতিষ্ঠানকে মহাত্মা গান্ধী পরিদর্শনে আসেন এবং একে 'ভারতের প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয়' হিসেবে অভিহিত করেন।
☑️৪. সামাজিক অবদান ও সংখ্যাতাত্ত্বিক প্রভাব
স্বামী শ্রদ্ধানন্দের কাজ সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গভীরে প্রোথিত ছিল:
🌼 নারীর ক্ষমতায়ন: তিনি ১৮৯০-এর দশকে পাঞ্জাবে 'কন্যা মহাবিদ্যালয়' প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল উত্তর ভারতে নারী শিক্ষার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
🌼দলিত আন্দোলন: তিনি ১৯২৩ সালে 'ভারতীয় দলিত উদ্ধার সভা' (Bhartiya Dalit Uddhar Sabha) গঠন করেন। তিনি দিল্লিতে অস্পৃশ্যদের জন্য পৃথক কূয়ো ও পাঠশালা তৈরির জন্য লড়াই করেন।
🌼শুদ্ধি আন্দোলন: ১৯২৩ সালে আগ্রা ও সংলগ্ন অঞ্চলে প্রায় ১৮,০০০ মালকানা রাজপুতকে (যাঁরা পূর্বে হিন্দু থেকে মুসলিম হয়েছিলেন) পুনরায় বৈদিক ধর্মে ফিরিয়ে আনেন। তাঁর নেতৃত্বে শুদ্ধি আন্দোলনের ফলে লক্ষাধিক মানুষ স্বধর্মে ফিরে আসার অনুপ্রেরণা পায়।
🔰শুদ্ধি আন্দোলন: সামাজিক ও সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
​শুদ্ধি আন্দোলন ছিল স্বামী শ্রদ্ধানন্দের জীবনের অন্যতম বিতর্কিত ও সাহসী পদক্ষেপ। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল—যাঁরা অতীতে প্রলোভন বা চাপে পড়ে হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করেছিলেন, তাঁদের সসম্মানে স্বধর্মে ফিরিয়ে আনা।
▫️​আন্দোলনের ব্যাপ্তি (১৯২৩ - ১৯২৬)
📍​মালকানা রাজপুত উদ্ধার: ১৯২৩ সালে তিনি 'ভারতীয় শুদ্ধি সভা' গঠন করেন। আগ্রা, মথুরা এবং ভরতপুর অঞ্চলে বসবাসকারী প্রায় ৩০,০০০ থেকে ৬০,০০০ মালকানা রাজপুত, যাঁরা কয়েক প্রজন্ম আগে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন কিন্তু রীতিনীতিতে হিন্দু ছিলেন, তাঁদের শুদ্ধি করে হিন্দু সমাজে ফিরিয়ে আনেন।
📍​সামাজিক মর্যাদা: তিনি কেবল ধর্ম পরিবর্তন করাননি, বরং উচ্চবর্ণের হিন্দুদের বাধ্য করেছিলেন এই মানুষদের সাথে একই পাতে বসে ভোজন করতে, যাতে তাঁরা সমাজে যথাযোগ্য মর্যাদা পান।
📍​নারীদের নিরাপত্তা: পাচারের শিকার হওয়া বা অপহৃত হওয়া হিন্দু নারীদের উদ্ধার করে তাঁদের পুনর্বাসন ও শুদ্ধি করানোর ক্ষেত্রে তিনি অগ্রণী ভূমিকা নেন।
☑️৫. রাজনৈতিক সক্রিয়তা ও সাহসিকতা
▪️দিল্লির রাজপথ (১৯১৯ খ্রি.): রাওলাট অ্যাক্টের প্রতিবাদে ৩০ মার্চ, ১৯১৯ সালে দিল্লির রাজপথে মিছিলে ব্রিটিশ গোর্খা বাহিনী যখন গুলি চালানোর হুমকি দেয়, তখন তিনি বুক চিতিয়ে বলেছিলেন, "সহি বুলেত মারো" (চালাও গুলি)। ব্রিটিশ সৈন্যরা তাঁর এই সাহসিকতা দেখে স্তম্ভিত হয়ে যায় এবং পিছু হটে।
▪️জামা মসজিদ ভাষণ (১৯১৯ খ্রি.): তিনিই প্রথম অ-মুসলিম এবং হিন্দু সন্ন্যাসী যাঁকে দিল্লির জামা মসজিদের মিম্বর (সিংহাসন) থেকে ভাষণ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেখানে তিনি 'ওম শান্তি' মন্ত্র দিয়ে বক্তৃতা শুরু করেছিলেন, যা সাম্প্রদায়িক ঐক্যের এক অনন্য নজির ছিল।
▪️ জেল জীবন: ১৯২২ সালে গুরু কা বাগ (Guru ka Bagh) আন্দোলনে শিখ ভাইদের সমর্থনে এবং অন্যান্য রাজনৈতিক কারণে তিনি একাধিকবার কারাবরণ করেন।
⚠️স্বামী শ্রদ্ধানন্দ ও গান্ধীর আদর্শগত বিরোধ
​হত্যাকাণ্ডের আগে থেকেই এই দুই নেতার মধ্যে কিছু বিষয়ে মতভেদ ছিল:
১. ​অহিংসা: স্বামী শ্রদ্ধানন্দ মনে করতেন প্রয়োজনের সময় অস্ত্র ধারণ বা শক্তি প্রদর্শন অন্যায় নয়, যা গান্ধীর 'চরম অহিংসা' নীতির বিরোধী ছিল।
২. ​খিলাফত আন্দোলন: গান্ধীজি খিলাফত আন্দোলনকে সমর্থন করেছিলেন, কিন্তু স্বামী শ্রদ্ধানন্দ মনে করেছিলেন এটি ভারতের হিন্দুদের জন্য ভবিষ্যতে বিপদ ডেকে আনতে পারে।
🔰৬. সাংবাদিকতা ও সাহিত্য
তিনি বৈদিক আদর্শ প্রচারের জন্য শক্তিশালী কলম ধরেছিলেন:
🔹সদ্ধর্ম প্রচারক (Saddharma Pracharak): এটি ছিল তাঁর সম্পাদিত বিখ্যাত সংবাদপত্র, যা শুরুতে উর্দুতে এবং পরে হিন্দিতে প্রকাশিত হতো।
🔹 অর্জুন (Arjun): ১৯২৩ সালে তিনি হিন্দি দৈনিক 'অর্জুন' শুরু করেন যা সামাজিক চেতনার এক বড় প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে।
🌼স্বামী শ্রদ্ধানন্দের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন🌼
​স্বামী শ্রদ্ধানন্দের পারিবারিক জীবন ছিল অত্যন্ত সুখী, কিন্তু তাঁর পত্নীবিয়োগ এবং মহর্ষি দয়ানন্দের আদর্শ তাঁকে বৈরাগ্যের পথে টেনে আনে।
​১. বিবাহ ও স্ত্রী
​১৮৭৭ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে মুনশিরাম বিজের বিবাহ সম্পন্ন হয়।
🔹​স্ত্রীর নাম: শিবা দেবী (Shiva Devi)।
🔸​দাম্পত্য জীবন: শিবা দেবী ছিলেন অত্যন্ত বিদুষী এবং ধর্মপরায়ণ নারী। স্বামী শ্রদ্ধানন্দ তাঁর আত্মজীবনীতে স্বীকার করেছেন যে, তাঁর উচ্ছৃঙ্খল জীবনকে সুপথে ফেরাতে এবং তাঁকে একজন খাঁটি মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে শিবা দেবীর অবদান ছিল অনস্বীকার্য।
▫️​বিয়োগ: মাত্র ৩৫ বছর বয়সে ১৮৯১ সালে শিবা দেবীর মৃত্যু হয়। স্ত্রীর মৃত্যুর পর মুনশিরাম আর দ্বিতীয়বার বিবাহ করেননি এবং পূর্ণব্রহ্মচর্য পালনের সিদ্ধান্ত নেন।
​২. সন্তানাদি (পুত্র ও কন্যা)
​স্বামী শ্রদ্ধানন্দের দুই পুত্র এবং দুই কন্যা ছিল। তিনি সন্তানদের আধুনিক শিক্ষার পরিবর্তে আর্য সমাজের আদর্শে গড়ে তুলেছিলেন।
(১) হরদত্ত বিদ্যলঙ্কার (জ্যেষ্ঠ পুত্র): তিনি পিতার প্রতিষ্ঠিত গুরুকুল কাঙ্গড়ি থেকে শিক্ষালাভ করেন এবং পরবর্তীতে আর্য সমাজের একজন বিশিষ্ট পণ্ডিত ও লেখক হিসেবে পরিচিত হন।
(২) ইন্দ্র বিদ্যাবাচস্পতি (কনিষ্ঠ পুত্র): তিনি ছিলেন একাধারে সাংবাদিক, স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং রাজ্যসভার সদস্য। তিনি 'বীর অর্জুন' পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
(৩) অমৃত দেবী (কন্যা): তিনি নারী শিক্ষা ও আর্য সমাজের প্রচারকার্যে যুক্ত ছিলেন।
(৪)শান্তি দেবী (কন্যা): তিনিও পিতার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন।
🔰ওকালতি ত্যাগ ও সন্ন্যাস গ্রহণ
​স্ত্রীর মৃত্যুর পর মুনশিরাম তাঁর সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করার দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯০২ সালে গুরুকুল কাঙ্গড়ি প্রতিষ্ঠা করেন। সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করার পর তিনি ব্যক্তিগত জীবনের মায়া ত্যাগ করেন।
🔸​সন্ন্যাস গ্রহণের তারিখ: ১৩ই এপ্রিল, ১৯১৭ খ্রি. (পয়লা বৈশাখ)।
☑️​ সন্ন্যাস জীবনের কঠোরতা
​সন্ন্যাস গ্রহণের পর তিনি তাঁর সমস্ত সম্পত্তি—যার মধ্যে জালন্ধরের বাড়ি, বাগান এবং মূল্যবান লাইব্রেরি ছিল—সবই গুরুকুল এবং আর্য সমাজের নামে দান করে দেন। তিনি গেরুয়া বস্ত্র পরিধান করতেন এবং অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন। এমনকি তাঁর পুত্রদেরও তিনি কোনো বিশেষ সুবিধা না দিয়ে সাধারণ ছাত্রদের মতোই গুরুকুলে বড় করেছিলেন। পারিবারিক মায়া ত্যাগ করা সহজ, কিন্তু ত্যাগের আদর্শকে জীবনে প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। স্বামী শ্রদ্ধানন্দ তা করে দেখিয়েছিলেন।
↗️৭. মহাপ্রয়াণের কালপঞ্জি
▪️হত্যাকাণ্ডের কাহিনী: কারণ ও প্রেক্ষাপট
​স্বামী শ্রদ্ধানন্দের হত্যাকাণ্ড ছিল বিংশ শতাব্দীর ভারতের অন্যতম চাঞ্চল্যকর ঘটনা। এটি ছিল তাঁর নির্ভীক সমাজ সংস্কারের চরম মূল্য।
✅ ​হত্যাকাণ্ডের কারণসমূহ
​১. শুদ্ধি আন্দোলনের সাফল্য: লক্ষ লক্ষ মানুষের হিন্দু ধর্মে প্রত্যাবর্তন কিছু কট্টরপন্থী মুসলিম নেতার মধ্যে ভীতি ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল।
২. লেখালেখি: তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা 'অর্জুন' এবং তাঁর বিভিন্ন ভাষণে তিনি ধর্মের গোঁড়ামির বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করতেন।
৩. রাজনৈতিক প্রভাব: খিলাফত আন্দোলনের পর ভারতে যে সাম্প্রদায়িক উত্তজনা তৈরি হয়েছিল, তার মাঝে শ্রদ্ধানন্দের জনপ্রিয়তা কিছু মহলের কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছিল।
▪️ ​হত্যাকাণ্ডের বিবরণ (২৩শে ডিসেম্বর, ১৯২৬ খ্রি.)
📍​স্থান: দিল্লির নয়া বাজার এলাকায় স্বামীজির নিজস্ব কক্ষ।
▫️​শারীরিক অবস্থা: স্বামীজি তখন গুরুতর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বিছানায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন।
▫️​আততায়ী: আব্দুল রশিদ নামক এক যুবক। সে প্রথমে ধর্ম নিয়ে আলোচনার অজুহাতে স্বামীজির কক্ষে প্রবেশ করে এবং এক গ্লাস জল চায়।
🔸​ঘটনা: স্বামীজির সেবক ধর্মপাল যখন জল আনতে যান, সেই সুযোগে রশিদ তাঁর পকেট থেকে রিভলভার বের করে খুব কাছ থেকে স্বামীজির বুকে ৩টি গুলি করে।
▪️​পরিণতি: ঘটনাস্থলেই ৭০ বছর বয়সী এই মহান বিপ্লবী সন্ন্যাসী প্রাণ হারান। ঘাতক আব্দুল রশিদকে পরবর্তীতে ব্রিটিশ সরকার বিচারে ফাঁসির দণ্ড দেয়।
⛔স্বামী শ্রদ্ধানন্দের হত্যাকাণ্ডের পর মহাত্মা গান্ধীর ভূমিকা এবং তাঁর দেওয়া বক্তব্য ভারতের ইতিহাসে অন্যতম বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। বিশেষ করে হিন্দু মহাসভা এবং আর্য সমাজের অনুসারীরা গান্ধীর এই অবস্থানকে 'তুষ্টির রাজনীতি' হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
স্বামী শ্রদ্ধানন্দের খুনি আব্দুল রশিদকে নিয়ে গান্ধীজি যে মন্তব্য করেছিলেন, সেটিই ছিল বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
📍​বেলগাঁও কংগ্রেস অধিবেশন (১৯২৬,খ্রি.): স্বামীজির মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন পর গুয়াহাটি ও বেলগাঁওয়ের অধিবেশনে গান্ধীজি শোকপ্রস্তাব পাঠ করেন। সেখানে তিনি খুনি আব্দুল রশিদকে "ভাই আব্দুল রশিদ" বলে সম্বোধন করেন।
▫️​গান্ধীর যুক্তি: গান্ধীজি বলেছিলেন, "আমি আব্দুল রশিদকে ভাই হিসেবেই দেখি। আমি তাকে এই খুনের জন্য দায়ী করি না, বরং দায়ী করি সেই পরিবেশকে যা ঘৃণা ছড়ায়।" তিনি আরও বলেছিলেন যে, একজন প্রকৃত হিন্দু হিসেবে তিনি খুনির প্রতি ঘৃণা পোষণ করতে পারেন না।
📍'ইয়ং ইন্ডিয়া' পত্রিকায় প্রবন্ধ (৩০শে ডিসেম্বর, ১৯২৬ খ্রি.)
​হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহ পর গান্ধীজি তাঁর নিজস্ব পত্রিকা 'Young India'-তে একটি দীর্ঘ নিবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি স্বামী শ্রদ্ধানন্দের প্রতি শ্রদ্ধা জানালেও কিছু মন্তব্য বিতর্ক উসকে দেয়। গান্ধীজি পরোক্ষভাবে স্বামীজির 'শুদ্ধি' আন্দোলনের সমালোচনা করে বলেছিলেন যে, এই ধরনের ধর্মপ্রচার বা ধর্মান্তরকরণ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পথে বাধা। তিনি বলেছিলেন, "স্বামীজি একজন বীরের মতো মারা গেছেন। কিন্তু যে আব্দুল রশিদ তাঁকে মেরেছে, সে অপরাধী হলেও তাকে ঘৃণা করা আমাদের ধর্মের পরিপন্থী।"
⚠️ গান্ধীজির এই অবস্থানের কড়া সমালোচনা করেছিলেন ড. বি. আর. আম্বেদকর। তিনি তাঁর 'Pakistan or the Partition of India' বইতে এই ঘটনার উল্লেখ করে লেখেন:
​আম্বেদকর বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন যে, কীভাবে একজন শান্তিকামী সন্ন্যাসীর হত্যাকারীকে গান্ধীজি 'ভাই' সম্বোধন করতে পারেন। ​তিনি অভিযোগ করেন যে, গান্ধীজি মুসলিম সমাজের কট্টরপন্থীদের চটাতে চাননি বলেই এই নরম সুর অবলম্বন করেছিলেন।
পরিশেষে বলা যায়, স্বামী শ্রদ্ধানন্দ কেবল একজন ব্যক্তি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি আদর্শ ও একটি প্রতিষ্ঠান। গুরুকুল কাঙ্গড়ির মাধ্যমে তিনি ভারতের শিক্ষাব্যবস্থাকে শেকড়ের সন্ধান দিয়েছেন, আবার শুদ্ধি ও সমাজ সংস্কারের মাধ্যমে অবহেলিত মানুষের মনে সঞ্চার করেছেন আত্মমর্যাদার নতুন আলো। তাঁর মৃত্যু ছিল সত্য ও ন্যায়ের প্রতি তাঁর আজীবন অবিচল থাকার এক চরম প্রতিদান। বেদমাতার এই বীর সন্তান চিরকাল তাঁর কর্মের মাধ্যমে মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে দীপ্যমান থাকবেন।
 
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর
সত্য প্রকাশে নির্ভীক সৈনিক

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.