জাগরণের উৎসব: ঋষিবোধ উৎসব
- (শান্তিধর্মী মাসিক পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও আদ্য সম্পাদক প্রয়াত পণ্ডিত চন্দ্রভানু আর্যোপদেশকের একটি প্রেরণাদায়ী ও প্রাঞ্জল নিবন্ধ)
শিবরাত্রি উৎসব হলো জাগরণের উৎসব। সম্ভবত এই উৎসবের নামের সাথে 'রাত্রি' যুক্ত থাকার অভিপ্রায় এটাই যে, ঘন অন্ধকারে 'জেগে থাকার' দায়বদ্ধতা আরও বেড়ে যায়। এমনিতে রাত্রি নিদ্রার জন্য এবং দিন জাগরণের জন্য। প্রতিটি রাত্রির শেষে সূর্যোদয় হয়, কিন্তু অজ্ঞানের রাত্রির অবসান কেবল জাগরণের মাধ্যমেই সম্ভব। যে যখন জাগে, তার জন্য তখনই সকাল। যে জাগে, তার জন্য প্রতিটি সকাল একটি আশীর্বাদ; আর যে জাগে না—জ্ঞানের আলোতেও চোখ বন্ধ করে জ্ঞান থেকে বঞ্চিত থাকে—তার জন্য প্রতিটি আশীর্বাদই অভিশাপে পরিণত হয়।
জাগরণের এই সুযোগ প্রতিটি মানুষের জীবনে অন্তত একবার অবশ্যই আসে, অনেকের জীবনে তো বহুবার আসে! প্রতিক্ষণ, প্রতিপল—প্রকৃতির প্রতিটি গতিবিধি, পরমেশ্বরের প্রতিটি ব্যবস্থা এবং আমাদের প্রতিটি অবস্থা আমাদের জাগরণের প্রেরণা দেয়। কিন্তু এই প্রেরণা ও স্ফুরণ খুব কম মানুষই বুঝতে পারেন এবং তাঁদের মধ্যেও খুব অল্পসংখ্যক মানুষ তা গ্রহণ করতে সমর্থ হন। যেমন সূর্য সবাইকে আলো দেয়, কিন্তু সেই আলো ও তাপ প্রতিটি প্রাণী নিজের সামর্থ্য ও অবস্থা অনুযায়ী কম বা বেশি গ্রহণ করে; তেমনি দয়ালু পরমেশ্বরও সবাইকে জ্ঞানের আলো দেন, কিন্তু মানুষ তার মনের গভীরে চাপা থাকা বাসনা ও আকাঙ্ক্ষার কোলাহলে সেই বাণী শুনতে পায় না। যদি কখনো সামান্য সেই শব্দ কানে পৌঁছায়ও, আমাদের আত্মিক দুর্বলতার কারণে অভ্যন্তরীণ শত্রুরা আমাদের মুখে কাপড় বেঁধে দেয়। ক্ষণস্থায়ী পার্থিব সুখের মোহের রশিতে বাঁধা পড়ে আমরা ছটফট করতেও ভুলে যাই। কিন্তু যখন বড় কোনো ধাক্কা লাগে, যখন আমরা হোঁচট খাই, তখন সমস্ত শিকল ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। আমরা শত্রুদের মোহপাশ থেকে মুক্ত হয়ে মমতা্ময়ী মায়ের কোল ফিরে পাই। মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু বদলে যায়—জীবনের দৃশ্যপট, উদ্দেশ্য এবং জীবনটাই পাল্টে যায়। যে যোগ্য হয়ে নিজের অন্তরের তৃষ্ণাকে চিনতে পারে, সে স্বয়ং উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। তার অন্তরে ও বাইরে আলোর লহরী বইতে থাকে এবং সে সমগ্র পৃথিবীকে আলোকিত করে যায়।
আজ থেকে ২০০ অধিক বছর আগে গুজরাটের টঙ্কারা গ্রামে এই জ্যোতি জ্বলে উঠেছিল। ১৪ বছরের বালক মূলশঙ্কর যখন শিবরাত্রির জাগরণে শিবলিঙ্গের ওপর ইঁদুরের দৌড়ঝাঁপ প্রত্যক্ষ করে, তখন তার মনে তোলপাড় শুরু হয়। আজ পর্যন্ত তার যে নিষ্ঠা, শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের ভিত্তি ছিল, তা কেঁপে ওঠে। সেই কঠিন সংকটের মুহূর্তে সে পিতার কাছে যায়, কিন্তু কোনো সমাধান পায় না। তার তৃষ্ণা জেগে ওঠে, শুরু হয় তার সত্যের সন্ধান—সেদিন থেকেই তার ‘বোধ পর্ব’ (জ্ঞান লাভের সূচনা) শুরু হয় এবং আজ অবধি সেই বোধ উৎসব বিশ্বকে আলোকিত করে চলেছে।
পণ্ডিত গুরুদত্ত বিদ্যার্থী—বিজ্ঞান ও সমসাময়িক চিন্তাবিদদের গভীর অনুরাগী ছাত্র ছিলেন। যুক্তি সেখানে হার মানত, কিন্তু তিনি কখনো সন্তুষ্ট হতেন না। যখন তাঁর গুরুর (দয়ানন্দ) দেহত্যাগের সময় এল—মৃত্যুর মুহূর্তেও সূর্যের মতো উজ্জ্বল জ্যোতির্ময় মুখচ্ছবি দেখে তিনি জেগে উঠলেন। তাঁর অন্তর জেগে উঠল, অন্ধকার পালিয়ে বাঁচল। তাঁর সাহিত্য পড়ে দেখুন, দয়ানন্দের সাথে অন্যের তুলনা যারা করেন তারা বুঝতে পারবেন যে, দয়ানন্দের একজন অতি সাধারণ শিষ্য—যার তখনও সব জ্ঞানের দাঁতও ওঠেনি—তিনি কত উচ্চকোটির দার্শনিক ছিলেন, যেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দার্শনিকদের শিরোমণি!
মুন্সিরাম (স্বামী শ্রদ্ধানন্দ)—এক কোতোয়ালের ছেলের ওপর এক জাদুকর যেন জাদু করে দিলেন। মা অনেক চেষ্টা করেছিলেন যেন তাঁর সন্তানের ওপর জাদুকরের নজর না পড়ে। কিন্তু জাদু তো জাদুই! পিতার সাথে সেই জাদুকরের (দয়ানন্দ) প্রবচন শুনতে গেলেন এবং চিরতরে তাঁরই হয়ে গেলেন। পাঠক চিন্তা করুন—‘সর্বস্ব’ কী হতে পারে! তিনি নিজের পরবর্তী প্রজন্মসহ সবকিছু দান করে দিলেন, যেন এক ‘সর্বমেধ’ যজ্ঞ! সেই শ্রদ্ধানন্দ শ্রদ্ধাকে যাপন করে দেখিয়েছেন এবং নিজের বুকে আততায়ীর গুলি খেয়েও তাঁর গুরুর প্রতি তর্পণ সম্পন্ন করেছেন।
পণ্ডিত লেখরাম— জ্ঞানের এক অনন্য সাধক, যাঁর অন্তরে দয়ানন্দ আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর সমস্ত সাধনা সমর্পণ করেছিলেন। নিজের একমাত্র শিশুপুত্রকেও উৎসর্গ করেছিলেন এবং নিজেও সেই পথেই বলিদান দিলেন। এমন অসংখ্য নাম রয়েছে, যারা নিজেদের রক্ত দিয়ে নিজেদের কাহিনী লিখে গেছেন। তাঁদের চোখ খুলে গিয়েছিল এবং তাঁরা সেই আলো নিজেদের অন্তরে আত্মস্থ করেছিলেন।
অজ্ঞানের সেই মূষিক (ইঁদুর) আজ আমাদের মনের শিবালয়েও লাফালাফি করছে। ভণ্ডামি আজও নতুন নতুন রূপ ধারণ করে আস্ফালন করছে। সেই কোলাহলে মানবজীবনের প্রকৃত চাওয়াগুলো মূক হয়ে হারিয়ে গেছে। মানুষের মনে তিক্ততা ও সংকীর্ণতা এতটাই বেড়ে গেছে যে, জ্ঞান আজ অবহেলিত হয়ে নিজ আসনের প্রতীক্ষা করছে। জ্ঞানের অভাব আগেও ছিল না, আজও নেই—অভাব কেবল জিজ্ঞাসু হৃদয়ের ক্ষুধার। প্রয়োজন শুধু চোখ খোলার। আলো থেকে মানুষের দূরত্ব কেবল ততক্ষণই, যতক্ষণ সে অজ্ঞানের মোহ ত্যাগ করে না। 'ক্লৈব্যং মাস্ম গমঃ পার্থ' (হে পার্থ, কাপুরুষতা পেয়ো না)—সময়ের শ্রীকৃষ্ণ আজ উচ্চস্বরে ডাক দিয়ে বলছেন, ওরে জ্ঞানের তৃষ্ণার্ত মানুষ! কাপুরুষ হোস না। উঠে দাঁড়া। অজ্ঞানের ওপর চূড়ান্ত আক্রমণ কর, বিজয় তোরই হবে। তুই একবার বিজয়ের যোগ্য হয়ে ওঠ, তোর অন্তর ও বাহির আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠবে।
