মহর্ষি দয়ানন্দের সামাজিক বিপ্লব — সকল মানুষের বেদাধ্যয়নের অধিকার

 
✅মহর্ষি দয়ানন্দের সামাজিক বিপ্লব — সকল মানুষের বেদাধ্যয়নের অধিকার
▪ স্ত্রীর বেদপাঠ নিষিদ্ধ করা—মূর্খতা, স্বার্থপরতা ও বুদ্ধিহীনতার পরিচয়
মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী তাঁর সত্যার্থ প্রকাশ-এর তৃতীয় সমুল্লাসে প্রশ্নোত্তর আকারে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে আলোচনা করেছেন—নারী ও শূদ্রের কি বেদ অধ্যয়ন করার অধিকার আছে? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি প্রচলিত সেই ধারণার তীব্র বিরোধিতা করেছেন, যার দ্বারা নারী ও শূদ্রদের বেদপাঠ থেকে বঞ্চিত করা হতো।
প্রশ্ন: নারী ও শূদ্রও কি বেদ পড়বে? তারা যদি বেদ পড়তে শুরু করে, তাহলে আমরা কী করব? তাদের বেদ পড়ার পক্ষে তো কোনো প্রমাণও নেই। বরং নিষেধের প্রমাণ রয়েছে—‘স্ত্রীশূদ্রৌ নাধীয়াতামিতি শ্রুতেঃ’—অর্থাৎ নারী ও শূদ্র বেদ অধ্যয়ন করবে না—এটাই শ্রুতি।
উত্তর: সমস্ত নারী ও পুরুষ, অর্থাৎ প্রত্যেক মানুষেরই বেদ অধ্যয়ন করার অধিকার আছে। তুমি কূপে পড়ো! এই কথিত শ্রুতি তোমার কল্পনা থেকে সৃষ্টি হয়েছে; কোনো প্রামাণিক গ্রন্থের তা নয়। বরং সমস্ত মানুষের বেদাদি শাস্ত্র পড়া ও শোনার অধিকারের প্রমাণ যজুর্বেদের ছাব্বিশতম অধ্যায়ের দ্বিতীয় মন্ত্রে রয়েছে—
‘যথে॒মাং বাচং॑ কল্যা॒ণীমা॒বদা॑নি॒ জনে॑ভ্যঃ।
ব্র॒হ্ম॒রা॒জ॒ন্যাভ্যাং শূদ্রায়॒ চার্যা॑য় চ॒ স্বায়॒ চার॑ণায় চ।
প্রি॒য়ো দে॒বানাং॒ দক্ষি॑ণায়ৈ দা॒তুরি॒হ ভূ॑য়াসম॒য়ং মে॒ কামঃ॒ সমৃ॑ধ্যতা॒মুপ॑ মা॒দো ন॑মতু॥’
এর অর্থ হলো—পরমেশ্বর যেমন সমস্ত মানুষের জন্য এই কল্যাণময় বাণী, অর্থাৎ সংসার ও মুক্তির সুখপ্রদানকারী ঋগ্বেদাদি চার বেদের জ্ঞান প্রকাশ করেছেন, তেমনই তোমরাও সকল মানুষের মধ্যে সেই জ্ঞান প্রচার করবে।
এখানে কেউ প্রশ্ন করতে পারে—‘জন’ শব্দ দ্বারা কি কেবল দ্বিজদের বোঝানো উচিত নয়? কারণ স্মৃতি প্রভৃতি গ্রন্থে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যেরই বেদ অধ্যয়নের অধিকার বলা হয়েছে; নারী ও শূদ্র প্রভৃতি বর্ণের নয়।
এর উত্তরে মহর্ষি দয়ানন্দ যজুর্বেদের সেই মন্ত্রেরই পরবর্তী অংশের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন—পরমেশ্বর নিজেই বলেছেন যে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র এবং মানুষের নিজের সেবক, নারী প্রভৃতি সকলের জন্যই বেদ প্রকাশ করা হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ বেদ অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা করবে, বেদশ্রবণ ও শ্রবণ করাবে, জ্ঞান বৃদ্ধি করবে, ভালো বিষয় গ্রহণ করবে, মন্দ বিষয় ত্যাগ করবে এবং দুঃখ থেকে মুক্ত হয়ে আনন্দ লাভ করবে।
তাহলে প্রশ্ন হলো—মানুষের কথা মানা হবে, নাকি পরমেশ্বরের কথা? অবশ্যই পরমেশ্বরের কথাই মান্য হওয়া উচিত। এরপরও যদি কেউ এই সত্য গ্রহণ না করে, তবে মহর্ষি দয়ানন্দের বক্তব্য অনুযায়ী সে ‘নাস্তিক’ বলে গণ্য হবে; কারণ ‘নাস্তিকো বেদনিন্দকঃ’ [মনু০ ২.১১]—যে বেদের নিন্দা করে এবং বেদের প্রামাণ্য স্বীকার করে না, তাকে নাস্তিক বলা হয়।
মহর্ষি দয়ানন্দ আরও প্রশ্ন করেন—পরমেশ্বর কি শূদ্রদের কল্যাণ চান না? ঈশ্বর কি পক্ষপাতী, যিনি দ্বিজদের জন্য বেদ পড়া ও শোনার বিধান করবেন, কিন্তু শূদ্রদের জন্য তা নিষিদ্ধ করবেন? যদি পরমেশ্বরের উদ্দেশ্য শূদ্রাদি মানুষের বেদপাঠ ও বেদশ্রবণ না-ই হতো, তবে তাঁদের শরীরে বাক্‌ ও শ্রবণেন্দ্রিয় সৃষ্টি করার প্রয়োজনই বা কী ছিল?
যেমন পরমাত্মা পৃথিবী, জল, অগ্নি, বায়ু, চন্দ্র, সূর্য ও অন্নাদি সমস্ত মানুষের জন্য সৃষ্টি করেছেন, তেমনই বেদের জ্ঞানও সকল মানুষের জন্য প্রকাশ করেছেন। অতএব বেদ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, বর্ণ বা গোষ্ঠীর একচেটিয়া সম্পত্তি নয়; তার জ্ঞান মানুষের কল্যাণের জন্য।
মহর্ষি দয়ানন্দ এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। যেখানে কোথাও বেদ অধ্যয়ন বা অধ্যাপনের নিষেধের কথা বলা হয়েছে, তার উদ্দেশ্য এই নয় যে জন্মের কারণে কোনো মানুষকে জ্ঞান থেকে বঞ্চিত করা হবে। বরং যার মধ্যে পড়াশোনা বা পড়ানোর সামর্থ্য নেই, যে বুদ্ধিহীন ও মূর্খতার কারণে জ্ঞান অর্জনে অক্ষম, তাকে ‘শূদ্র’ বলা হয়েছে—তার ক্ষেত্রে পড়া বা পড়ানো অর্থহীন হতে পারে। কিন্তু নারীদের বেদপাঠ নিষিদ্ধ করার যে ধারণা প্রচলিত হয়েছে, মহর্ষি দয়ানন্দ তার বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় বলেছেন—এটি মূর্খতা, স্বার্থপরতা ও বুদ্ধিহীনতার ফল।

  • মহর্ষি দয়ানন্দের কঠোর ভাষার অন্তর্নিহিত কারণ
কেউ কেউ মহর্ষি দয়ানন্দের এই বক্তব্যের ভাষাকে কঠোর বলে মনে করতে পারেন। কিন্তু তাঁর বক্তব্যের প্রেক্ষাপট বুঝলে সেই কঠোরতার কারণও স্পষ্ট হয়। ড. ভবানীলাল ভারতীয় লিখেছেন যে, নারী, শূদ্র এবং অন্যান্য নিপীড়িত শ্রেণির ওপর যে অমানবিক অত্যাচার চলত, তা দেখে মহর্ষি দয়ানন্দের হৃদয় যেমন ব্যথিত হয়েছিল, তেমনই তাঁর অন্তরও প্রতিবাদে চিৎকার করে উঠেছিল।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে মানুষগুলি নির্যাতিত, নিপীড়িত ও শোষিত হয়ে এসেছে, তাদের হাহাকার যখন তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তখন তাঁর মধ্যে গভীর মানসিক বেদনা সৃষ্টি হয়েছিল। আর সেই ব্যাকুল মানসিক অবস্থাতেই তিনি তাঁদের ওপর অত্যাচারকারী সমাজের পণ্ডিত, পুরোহিত এবং অন্যান্য কর্তৃত্বশীল ব্যক্তিদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর হয়ে উঠেছিলেন।
এখানে যে বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়, তা হলো—প্রতিপক্ষ শুধু নারী ও শূদ্রদের বেদাধিকার অস্বীকার করেনি; বরং প্রশ্ন করেছিল—‘এরা যদি বেদ পড়তে শুরু করে, তাহলে আমরা কী করব?’ অর্থাৎ বেদশিক্ষা থেকে তাঁদের বঞ্চিত রাখার সঙ্গে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও জীবিকার প্রশ্নও যুক্ত ছিল। মহর্ষি দয়ানন্দের দৃষ্টিতে এই অবস্থান ছিল আরও গুরুতর, কারণ জ্ঞানকে নিজের স্বার্থরক্ষার উপায় হিসেবে ব্যবহার করে অন্য মানুষকে অজ্ঞতার মধ্যে রাখা ধর্মের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।
এই কারণেই মহর্ষি দয়ানন্দের উত্তর এত তীব্র। তিনি বলতে চেয়েছেন—কিছু মানুষের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য নারী ও শূদ্রদের জ্ঞান থেকে বঞ্চিত করা চলবে না। যদি কেউ নিজের স্বার্থের জন্য মিথ্যা বা কল্পিত শ্রুতির আশ্রয় নিয়ে অন্যদের বেদাধিকার অস্বীকার করে, তবে সেই স্বার্থের জন্য সে যেন নিজের পথ নিজেই বেছে নেয়; কিন্তু তার স্বার্থের বোঝা অন্য মানুষকে বহন করতে হবে না।
ড. ভবানীলাল ভারতীয়ের ব্যাখ্যায়, মহর্ষি দয়ানন্দের এই কঠোরতা ব্যক্তিগত বিদ্বেষ থেকে উদ্ভূত ছিল না; বরং দীর্ঘকাল ধরে নিপীড়িত মানুষের দুর্দশার বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদী চেতনা থেকেই এই ভাষার উদ্ভব। তাঁর রোষ ছিল সেইসব স্বার্থান্ধ প্রবণতার বিরুদ্ধে, যেগুলি ধর্ম ও শাস্ত্রের নামে মানুষের জ্ঞানলাভের অধিকারকে সীমাবদ্ধ করেছিল। [নবজাগরণের পুরোধা দয়ানন্দ সরস্বতী, প্রথম সংস্করণ ১৯৮৩ খ্রি., পৃষ্ঠা ৫৬৯-৫৭০]
 
  • 🔰বেদাধিকার—জন্ম নয়, মানবমাত্রের অধিকার
মহর্ষি দয়ানন্দের বক্তব্যের মূল বিষয়টি তাই অত্যন্ত পরিষ্কার—জ্ঞান কোনো মানুষের জন্মগত অধিকার বা একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। পরমেশ্বর যখন সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের জন্য বেদের জ্ঞান প্রকাশ করেছেন, তখন মানুষের উচিত সেই জ্ঞান সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
নারী হোক বা পুরুষ, ব্রাহ্মণ হোক বা শূদ্র—মানুষের জ্ঞানলাভের আকাঙ্ক্ষাকে কেবল জন্মপরিচয়ের ভিত্তিতে বন্ধ করে দেওয়া মহর্ষি দয়ানন্দের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। তাঁর দৃষ্টিতে বেদের উদ্দেশ্য হলো মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধি করা, সত্য ও অসত্যের বিচার করার ক্ষমতা তৈরি করা, শুভকে গ্রহণ ও অশুভকে বর্জন করতে শেখানো এবং মানুষকে দুঃখ থেকে মুক্তির পথে পরিচালিত করা।
এই কারণেই নারী ও শূদ্রের বেদাধিকার প্রসঙ্গে মহর্ষি দয়ানন্দের বক্তব্যকে কেবল একটি শাস্ত্রীয় বিতর্ক হিসেবে দেখলে বিষয়টির সম্পূর্ণ তাৎপর্য ধরা পড়ে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিক্ষার অধিকার, জ্ঞানের অধিকার এবং মানুষের মর্যাদার প্রশ্ন। তাঁর প্রতিবাদের কেন্দ্রে ছিল—ধর্মের নামে এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যার ফলে মানুষের জ্ঞানার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যায় এবং কিছু মানুষের স্বার্থ রক্ষার জন্য অন্য মানুষকে অজ্ঞতার মধ্যে রাখা হয়।
 
অতএব মহর্ষি দয়ানন্দের সামাজিক সংস্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—বেদীয় জ্ঞানকে সমাজের বৃহত্তর পরিসরে পৌঁছে দেওয়া এবং নারীসহ সকল মানুষের শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে শাস্ত্রীয় ভিত্তি উপস্থাপন করা। তাঁর কঠোর ভাষার অন্তরালে ছিল এই মৌলিক প্রত্যয়—সত্য ও জ্ঞানের দরজা মানুষের জন্য বন্ধ করা নয়, বরং সকল মানুষের জন্য তা উন্মুক্ত করা।

© বাংলাদেশ অগ্নিবীর

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.