মহর্ষি দয়ানন্দ ও হিন্দু-সমাজের সংকীর্ণতা দূরীকরণ

✅মহর্ষি দয়ানন্দ ও হিন্দু-সমাজের সংকীর্ণতা দূরীকরণ

স্বামী দয়ানন্দের ওপর কিছু অজ্ঞ মানুষ এই বলে অভিযোগ করে যে, 'স্বামীজি হিন্দু সমাজকে সংকীর্ণ করে তুলেছেন'। স্বামীজির উপর এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, কারণ হিন্দু সমাজ তো আগেই এতটাই সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল যে, তাতে নতুন করে আর সংকীর্ণতা আনার কোনো অবকাশই ছিল না। সনাতন ধর্মের প্রসিদ্ধ পণ্ডিত নেকিরাম শর্মা ১৯২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি 'তেজ' নামক সংবাদপত্রে এই মর্মে কিছু কথা স্বীকার করে বলেছিলেন, 'যে ধর্ম একদিন সমগ্রপৃথিবীর অদ্বিতীয় এবং অসীম প্রভাবসম্পন্ন ধর্ম ছিল, আজ তা সঙ্কুচিত হতে হতে কত ছোট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে'।
 
এর বিপরীতে, স্বামী দয়ানন্দ আজীবন হিন্দু সমাজের সেই সংকীর্ণতা দূর করার চেষ্টা করেছেন, যা বেদের জ্ঞান না জানা এবং অন্ধবিশ্বাস ও অজ্ঞানতা মেনে চলার কারণে হিন্দু সমাজে প্রবেশ করেছিল। স্বামীজী কীভাবে ভগীরথ প্রচেষ্টা করে হিন্দু সমাজে নতুন জাগরণ আনার চেষ্টা করেছেন, আসুন, সে বিষয়ে সংক্ষেপে একবার দৃষ্টি দেওয়া যাক-
১. হিন্দু সমাজ শূদ্রদের শিক্ষা দেওয়া এবং বেদের বার্তা শোনানোর ব্যাপারেও কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। আধুনিক ভারতে স্বামী দয়ানন্দই প্রথম এমন উপেদশক, যিনি শূদ্রদের কেবল শিক্ষাই নয়, দ্বিজদের (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য) সমান বেদ পাঠ করারও অধিকার দিয়ে হিন্দু সমাজের সংকীর্ণতা দূর করেন।
২. হিন্দু সমাজ শূদ্রদের মতোই নারী জাতিকেও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রাখত এবং তাদের কেবল গৃহস্থালির কাজ, সন্তান উৎপাদন এবং রান্নাঘরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখত। স্বামী দয়ানন্দ কেবল গার্গী ও মৈত্রেয়ী-র মতো প্রাচীন বিদুষীদের উদাহরণ দিয়েই নারী জাতিকে শিক্ষার অধিকার দেননি, বরং তাদের মাতৃশক্তি হিসেবে উপযুক্ত সম্মানও দেন, যার ফলে হিন্দু সমাজের সংকীর্ণতা দূর হয়।
৩. হিন্দু সমাজে বাল্যবিবাহ, বৃদ্ধবিবাহ, বহুবাহ এবং মিথ্যা জাতপাতের ছোট গন্ডির মধ্যে বিবাহ করা ইত্যাদি প্রথা ছিল। স্বামী দয়ানন্দ ব্রহ্মচর্য সহকারে ছেলে-মেয়ের গুণ ও কর্ম অনুসারে, বিস্তৃত মানব সমাজে সর্ব সর্বণে বিবাহ এবং এক পতি-পত্নী ব্রতের বিধান দিয়ে হিন্দু সমাজের সংকীর্ণতা দূর করেন।
৪. হিন্দু সমাজে নির্দোষ এবং অবোধ বাল্যবিধবাদের জোর করে জন্মভর বৈধব্যের মহাকষ্টময় জীবনে রাখা হতো। স্বামী দয়ানন্দ শাস্ত্র এবং যুক্তির ভিত্তিতে বিধবা বিবাহের প্রমাণ দিয়ে এই বংশনাশক কুপ্রথাকে সমূলে উৎপাটন করেন, যার ফলে হিন্দু সমাজের সংকীর্ণতা দূর হয়।
৫. হিন্দু সমাজে জন্মগত বা বংশানুক্রমিক শ্রেষ্ঠত্বের মিথ্যে অহংকার থেকে বংশানুগত বর্ণ-ব্যবস্থা মানা হতে শুরু করেছিল। স্বামী দয়ানন্দ মানুষ মাত্রকেই গুণ ও কর্ম অনুযায়ী বর্ণপ্রাপ্তির অধিকারী প্রমাণ করেন, যার ফলে হিন্দু সমাজের সংকীর্ণতা দূর হয়।
৬. হিন্দু সমাজে ঐক্যের বিরোধী পুরাণ তথা স্মার্তসিদ্ধান্ত প্রসূত মিথ্যা জাত-পাত এবং ছোঁয়াছুঁয়ির বন্ধন এতটাই দৃঢ় ও ভয়ানক হয়ে উঠেছিল যে, এর ফলে হিন্দু জাতি নিজেদেরই ধর্মের অনুসারী হিন্দু ভাইদের সাথে পশুর চেয়েও খারাপ ব্যবহার করতে করতে দিনে দিনে শেষ হয়ে যাচ্ছিল। স্বামী দয়ানন্দ মিথ্যা জাত-পাত এবং ছোঁয়াছুঁয়ির মানসিক রোগকে বৈদিক জ্ঞানের ঔষধ দিয়ে দূর করে, তাদের সংগঠিত হওয়ার শিক্ষা দেন, যার ফলে হিন্দু সমাজের সংকীর্ণতা দূর হয়।
৭. হিন্দু সমাজ ভুলে বৈদিক সার্বভৌমিক ধর্মের দ্বার বৈদিক ধর্ম থেকে পতিত হওয়া মানুষ এবং অ-হিন্দুদের জন্য একেবারে বন্ধ করে দিয়ে নিজেদের এবং নিজেদের ধর্মকে একটি ছোট গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছিল। স্বামী দয়ানন্দ দেশ, সম্প্রদায় এবং বংশের ভেদাভেদ না করে প্রতিটি মানুষকে তার অধিকারী বলে ঘোষণা করে এবং সর্বসাধারণকে তাতে শামিল হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে হিন্দু সমাজের সংকীর্ণতা দূর করেন।
৮. হিন্দু সমাজে জ্ঞানশূন্য, অসার কৃপা-কার্যকলাপ এবং বিশ্বাসকেই ধর্ম বলে মনে করা হতো এবং নিজের গুরুদের কৃপাতেই মুক্তি মিলবে, এমনটা মেনে নিয়ে নিজেকে বাধ্যতা ও দাসত্বের জীবনে রাখা হতো। স্বামী দয়ানন্দ মানুষ মাত্রের চিন্তা ও আচরণের জন্মগত স্বাধীনতার ঘোষণা করে সদাচার ও আত্মজ্ঞান লাভের মাধ্যমে মোক্ষ প্রাপ্তির কথা বলে দাসত্বের সঙ্কুচিত জীবন থেকে হিন্দু সমাজকে মুক্ত করেন।
৯. হিন্দু সমাজে এক ঈশ্বরের পরিবর্তে গুরু, পীর ও পয়গম্বর ইত্যাদির মানুষের পূজা রূপে প্রচার হয়ে গিয়েছিল। স্বামী দয়ানন্দ পরমেশ্বরের মর্যাদা রক্ষা করে এবং বহু তথাকথিত পরস্পরবিরোধী ঈশ্বরতত্ত্ব ও উপাসনার স্থলে বৈদিক সনাতন ধর্মের এক সত্য সর্বব্যাপী পরমাত্মার সত্যিকারের পূজা করতে শেখান, যার ফলে হিন্দু সমাজের সংকীর্ণতা দূর হয়।
১০. হিন্দু সমাজে পারস্পরিক ঘৃণা ছড়ানো ছোঁয়াছুঁয়ির কারণে একসাথে বসে না খাওয়া, একজনের হাতের খাবার না খাওয়া ইত্যাদির ঝামেলা শুরু হয়ে গিয়েছিল। স্বামী দয়ানন্দ চারটি বর্ণের মানুষের শুদ্ধ পদ্ধতিতে তৈরি খাবার একসাথে বসে খাওয়ার উপদেশ দিয়ে এই ভুল ধারণা দূর করেন, যার ফলে হিন্দু সমাজের সংকীর্ণতা দূর হয়।
যে হিন্দু তার আধুনিক পথ-প্রদর্শকদের সংকীর্ণতা এবং দূরদর্শিতার অভাবে আত্মনির্ভরতা, আত্মরক্ষা, সামাজিক সংগঠন, স্বাধীনতা, দেশভক্তি এবং স্বরাজ্য ইত্যাদি মানবীয় ও জাতীয় শ্রেষ্ঠ গুণের অনুভূতি হারিয়ে লাশের মতো হয়ে গিয়েছিল, সেই হিন্দু আবার স্বামী দয়ানন্দের জীবনদায়ী শিক্ষা দ্বারা জীবিত হয়ে উঠেছে।
যদি এটাই সেই সংকীর্ণতা হয়, যা স্বামী দয়ানন্দ হিন্দু সমাজে সৃষ্টি করেছেন, তবে আমাদের এমন সংকীর্ণতার ওপর গর্ব হয়, আমরা সেই গর্ব আজীবন লালন করব।
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.